আমরা যারা ছোটবেলায় খেলাধুলোয় ভালো ছিলাম না, অথচ প্রতি মুহূর্তে যাদের মন পড়ে থাকত খেলার মাঠে। সেই ‘দুধেভাতে’ ব্যর্থ খেলুড়েদেরও মহানায়ক টেম্বা বাভুমা। উচ্চতা পাঁচ ফুট সাড়ে তিন ইঞ্চি। গায়ের রং কালো।
আপনাকেও তো কম টিটকিরি সহ্য করতে হয়নি। কখনো উচ্চতা নিয়ে, কখনো রং নিয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকা, যে দেশে কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটার হওয়াটা অভিশাপ! অ্যাপার্থাইড যে বৈষম্যের বিষগাছ পুঁতেছে, সে তো আর রাতারাতি উপড়ে ফেলা যায় না।
সে বৈষম্য আজও দক্ষিণ আফ্রিকা জুড়ে। তাছাড়া নিজের দেশের হয়ে ক্রিকেট-মাঠে আপনি যে সাফল্য অর্জন করেছেন, সেটাকেই বা গুরুত্ব দেওয়া হল কবে?
ক্রিকেটজীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত শুধু ‘কোটার ক্রিকেটার’ ছাড়া অন্য কোনও তকমা তো পাননি। দক্ষিণ আফ্রিকার দলের শক্তি দুর্বলতা নিয়ে যখন কাটাছেঁড়া করা হয়, তখনও তো আপনাকে কেউ তেমন গুরুত্ব দেয়নি। অথচ এই ‘কোটা’র ক্রিকেটার হিসেবেও গত তিন বছরে প্রায় ৬০ গড় রেখে টেস্টে রান করে চলছেন।

আসলে আপনাকে দেখে কারও মনেই সমীহ আসে না হয়তো। সত্যিই তো ৬০’র বেশি টেস্ট খেলে সাড়ে তিন হাজারের কাছাকাছি রান, মোটে ৪টি সেঞ্চুরি আর ২৪টা হাফসেঞ্চুরি।
আসলে ব্যাটার হিসাবে আপনি নিতান্তই মধ্যমানের। আলাদা করে আপনার কোনও শট মনে রাখার মতো নয়। আপনার কটা ইনিংসই বা ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে দাগ কেটেছে!
যাকে প্রতি মুহূর্তে হেনস্তা হতে হয়। যাকে কেউ গুরুত্ব দেয় না। যার সাফল্যকে সাফল্য হিসাবে গণ্য করা হয় না। বরং সেটা নিয়ে কাটাছেড়া করা হয়। খাটো করে দেখানো হয়।
যার দেহের গড়ন, কাজের ধরন, নিয়ে টিকা টিপ্পনী আমোদের কারণ। চিন্তা করবেন না টেম্বা বাভুমা, আপনার মতো মানুষ ছড়িয়ে রয়েছে বিশ্বজুড়ে। যাদের ছোটবেলা থেকে নানা কারণে কটাক্ষ শুনে যেতে হয়। যাদের নাম বিকৃত করা হয়।
যাদের নামে কার্টুন বানানো হয়। যাদের একা পেলে শারীরিক বা মানসিকভাবে হেনস্তা করতেও পিছপা হন না বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সদস্যরা। আপনি সেইসব মানুষের প্রতিনিধি।
আরো পড়ুন : বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় পাঁচ খেলা

টেম্বা বাভুমা, আপনি সেইসব মধ্যমেধার মানুষের প্রতিনিধি যারা কোনও কিছুতেই সেরা নয়। যারা কোনওদিন ক্লাসে প্রথম হয়নি। যারা কোনও দিন খেলাধুলা করে পদক জেতেনি। যাদের উপস্থিতিকে সমাজজীবনে কেউ গুরুত্ব দেয় না।
যারা প্রতিদিন জীবনের লড়াইয়ে হেরে যেতে থাকে। যারা প্রতিনিয়ত ধাক্কা খেতে থাকে। হারতে হারতে যারা জিততে ভুলে গেছে।স্কুলে আপনার মতো মানুষরা প্রথম বেঞ্চের তুখোড় পড়ুয়া ও লাস্ট বেঞ্চের বেপরোয়া বিচ্ছুদের ভিড়ে কার্যতই অদৃশ্য থেকে যান। নিয়মিত নিজের কাজটা সঠিকভাবে করে যাওয়ার পরও যাদের কেউ ‘নোটিস’ করে না। আপনি সেইসব চরিত্রাভিনেতাদেরও প্রতিনিধি।
যারা ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখে আসছে, একটা সুযোগ, একটা সুযোগ পেলে সব উপেক্ষার জবাব দিয়ে দেবে। যারা স্বপ্ন দেখে, কোনও দিন উপেক্ষা আর কটাক্ষের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে কিছু একটা করে দেখাবে।
যারা রোজ রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ভাবে, পরদিন নতুন সূর্য উঠবে। যার ছটায় বদলে যাবে সবকিছু। সবাই তাকে গুরুত্ব দেবে। আপনি সেই আমার প্রতিনিধি বারবার তীরে এসে যার তরী ডুবে যায়। আপনারও ডুবেছে। জীবনে কম ব্যর্থতা দেখতে হয়নি। কিন্তু আপনি থামেননি। আপনি লড়ে গেছেন। সেই লড়াইয়ে জিতেও গেছেন।

শেষ ল্যাপে এসে নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন। চোট উপেক্ষা করে জীবনের অন্যতম সেরা ইনিংসের পরও অবশ্য লাইমলাইট পুরোপুরি আপনার উপর নেই।
আপনারই সতীর্থ আপনার চেয়েও ভালো ইনিংস খেলে আলো কেড়ে নিয়েছেন। তাতে অবশ্য আপনার হিংসে নেই। সতীর্থের সাফল্যে আপনি বরাবরই খুশি হন। যেমনটা আজও হলেন।
মার্করামের সেঞ্চুরির পর খোঁড়া পায়ে আপনার লাফিয়ে ওঠার সেই দৃশ্য মনে থাকবে। তবে এরই পাশাপাশি মনে থেকে যাবে যখন আজ, ঐতিহ্যবাহী লর্ডসের দর্শকরা সকলে আপনার জন্য উঠে দাঁড়ালেন, সেই সোনালি মুহূর্তটাও।
টেম্বা বাভুমা, আপনি লাইমলাইটে না থেকেও খুশি। আপনার মতো খুশি আমরাও। আমরা যারা আপনারই মতো অবহেলিত। আমরা যে দিনবদলের স্বপ্ন দেখি, আর যারা প্রতিদিন হেরে যাই, আপনি তাদের হয়েও লড়াইটা জিতেছেন।