মাত্র ১৫ মিনিটে ৩৫০ টাকায় করোনা শনাক্ত সম্ভব !

ড. বিজন কুমার শীলের নেতৃত্বে ড. নিহাদ আদনান, ড. মোহাম্মদ রাশেদ জমিরউদ্দিন ও ড. ফিরোজ আহমেদ বাংলাদেশের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসক। বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া নতুন করোনাভাইরাস কোভিড-১৯ পরীক্ষার সহজ ও কম মূল্যের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। হাসপাতালটির প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ১৮ মার্চ-২০২০ গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ‘এটা সত্যি ঘটনা। এটা ভিন্ন পদ্ধতি। এর নাম হলো: র‌্যাপিড ডট ব্লট বলে জানান তিনি।

ব্লাড গ্রুপ যে পদ্ধতিতে চিহ্নিত করা হয় এটা মোটামুটি সে রকমের একটি পদ্ধতি। ২০০৩ সালে যখন সার্স ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দিয়েছিল তখন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. বিজন কুমার শীল সিঙ্গাপুর গবেষণাগারে কয়েকজন সহকারীকে নিয়ে সার্স ভাইরাস দ্রুত নির্ণয়ের পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।

র‌্যাপিড ডট ব্লট’ পদ্ধতিটি ড. বিজন কুমার শীলের নামে পেটেন্ট করা। পরে এটি চীন সরকার কিনে নেয় ও সফলভাবে সার্স মোকাবেলা করে। তারপর তিনি সিঙ্গাপুরেই গবেষণা করছিলেন ডেঙ্গুর ওপরে। গবেষণা চলাকালে তিনি দুই বছর আগে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে যোগ দেন। গণ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যখন যোগ দিলেন তখন তিনি ডেঙ্গু নিয়ে কাজ করছিলেন।

২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরে নতুন করোনাভাইরাস দেখা দিলে তিনি জানান, এটা (নতুন করোনাভাইরাস) হলো সার্সের রূপান্তরিত রূপ। এটা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করবে। উনি এটা বুঝতে পেরেছিলেন। তখন কেউ চিন্তা করেনি করোনাভাইরাস এমন প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। তিনি তখন বলেছিলেন, করোনাভাইরাস নিয়ে আমাদের গবেষণা করা দরকার।’

উনি গণবিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালের প্রধান বিজ্ঞানী। উনি সাভারে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ক্যাম্পাসে থাকেন। উনি গত দুই মাসে করোনার গবেষণা পারফেক্ট করেন। এই পদ্ধতিতে ৫ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত করা যাবে। এটা করতে রিএজেন্ট লাগে। কেমিক্যাল রিএজেন্টগুলো সহজলভ্য না। এগুলো পাওয়া যায় সুইজারল্যান্ড, আমেরিকা ও ব্রিটেনে।

এখন এটি বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র এর অনুমোদনের জন্যে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে আবেদন করেছে। এখন শুধু অনুমোদনের অপেক্ষা। অনুমোদন পাওয়া গেলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদনে যাবে বলে গণস্বাস্থ্য ট্রাস্টি সূত্রে জানা যায়।

প্রচলিত কিট যেটা ব্যবহৃত হচ্ছে সেটা খুবই ব্যয়বহুল। এর জন্যে একটা দামী যন্ত্র প্রয়োজন হয়। সেই যন্ত্র সব মেডিকেল কলেজে নেই। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে তিনটা আছে। সারাদেশে এই যন্ত্র খুব বেশি নেই। আইইডিসিআরের কাছে একটা যন্ত্র আছে। এ কারণে তারা এখন পর্যন্ত মাত্র ২৬৮ জনের করোনা পরীক্ষা করতে পেরেছে। অথচ পরীক্ষা করা উচিত ছিল হাজার-হাজার।

বাংলাদেশি চিকিৎসক ড. বিজন কুমার শীল

ড. বিজন ও তার দলের উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে ৩৫০ টাকায় ১৫ মিনিটে করোনা শনাক্ত সম্ভব। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে মাত্র ৫ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে শনাক্ত করা যাবে করোনা সংক্রমণ হয়েছে কি না। এতে খরচ পড়বে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকার মতো। সরকার যদি এর ওপর ট্যাক্স-ভ্যাট আরোপ না করে তাহলে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বাজারজাত করতে পারবে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।

তবে সবকিছু নির্ভর করছে সরকারের মর্জির ওপরে। ডেঙ্গু টেস্টের যেমন মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল করোনা টেস্টেরও যদি মূল্য নির্ধারণ করে দেয় তাহলে জনগণ স্বল্প মূল্যে সেবা পাবেন। মূল্য নির্ধারণ না করে দিলে যে যার যার মতো টাকা নেবে।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র মাসে এক লাখ কিট সরবরাহ করতে পারবে। তবে সবকিছু ঠিক থাকলে প্রাথমিকভাবে এই মাসে ১০ হাজার কিট সরবরাহ করতে পারবে। আরও একটি খুশির সংবাদ হলো আমেরিকার একটি সংস্থা  জানিয়েছে তারাও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র উদ্ভাবিত এই ‘র‌্যাপিড ডট ব্লট’ উৎপাদন করবে। এ কথা তারা ড. বিজনকে জানিয়েছে বলে ডা. জাফরুল্লাহ জানান।

গবেষণা দলের সদস্য ড. নিহাদ আদনান বলেন, ‘অনুমোদন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ড. বিজন কুমার শীল ও ড. মহিবুল্লাহ ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে গিয়েছিলেন। অনুমোদন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। সাধারণত এ ধরনের অনুমোদন একটু সময় সাপেক্ষ। তবে জাতীয় স্বার্থের গুরুত্ব বিবেচনায় অল্প সময়ের মধ্যে অনুমোদন পাওয়া যাবে বলে আশা তার।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র কাজ শুরু করে ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই:

২০১৯ সালের নভেম্বরে চীনের উহানে করোনা ভাইরাস ধরা পড়ে। এ ভাইরাসের টেস্ট কিট উৎপাদনের জন্য এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই কাজ শুরু করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। করোনা ভাইরাস ডায়াগনোসিস করার একটি পদ্ধতির নাম হল রিভার্স ট্রান্সকিপশন পলিমারেজ চেইন (Reverse transcription polymerase chain reaction—rRT-PCR)। বাংলাদেশে এই ধরণের সিস্টেমে ডায়াগনোসিস করার পদ্ধতি খুব কষ্টসাধ্য। কারণ এর জন্য খুব দক্ষ জনবল এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ল্যাব প্রয়োজন। এই পদ্ধতিতে ডায়াগনোসিস করতে কয়েক ঘন্টা থেকে দু’দিন পর্যন্ত সময় লাগে।

এছাড়া আরেকটি ডায়াগনোসিস করার পদ্ধতির নাম এন্টিবোডি এ্যাসে (IgA,IgG and IgM immunoassay)। এই পদ্ধতিতে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডায়াগনোসিস করা সম্ভব। করোনার আগের রূপ SARS-COV-2 নভেম্বর ২০১৯ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৮৪ বারের বেশি তার জিনের গঠন পরিবর্তন করেছে। নতুন স্থানে নতুন পরিবেশে টিকে থাকতে এ ভাইরাস তার জিনের গঠন পরিবর্তন করে।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশ তাদের প্রয়োজনে করোনা ভাইরাসের কিট তৈরী করলেও বাংলাদেশে এমন কাজ অন্য কেউ এখনো করেনি। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য-আরএনএবায়োটেক লিমিটেড বাংলাদেশের মানুষের জন্য কোভিড-১৯ এর অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য পিওসি (POC-point-of care) কিট ডেভেলপ করার চেষ্টা করে আসছে।

গণস্বাস্থ্যের সুদক্ষ টিম এই কিটের ডিজাইন এবং উৎপাদন করার কাজ করছে। এর আগে ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসের ডায়াগনোসিস কিট (SARSPOC kit) তৈরীর সময় সিঙ্গাপুরে কাজ করেছেন ড. বিজন কুমার শীল। তিনিই গণস্বাস্থ্যের এই টিমের অধিনায়কত্ব করছেন।

এই কিট তৈরীর জন্য বিএসএল টু প্লাস(BSL 2+) ল্যাব তৈরীর কাজ প্রায় শেষের দিকে। এর জন্যে রিএজেন্ট এবং ইকুইপমেন্টও যোগাড় করা হচ্ছে। গণস্বাস্থ্য-আরএনএ বায়োটেকের পক্ষে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়। যে পদ্ধতিতে এই কিট তৈরি করা হবে তাকে বলা হয় ‘ডট ব্লট টেকনোলজি’।

যেভাবে এই কিট নতুন করোনা ভাইরাস শনাক্ত করবে

আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে এই কিটে ভাইরাস শনাক্ত করা যাবে। এর জন্য স্পুটাম নেয়ার প্রয়োজন নেই। প্রথমে সন্দেহজনক ব্যক্তির রক্তের নমুনা নেওয়া হবে। সেই রক্ত থেকে ‘সিরাম’ আলাদা করতে হবে। কিটে সেই সিরাম রেখে তার ওপর এন্টিজেনের বিক্রিয়া ঘটানো হবে।

যদি বিক্রিয়া হয় তাহলে সন্দেহজনক ব্যক্তির শরীরে ভাইরাসের প্রাথমিক উপস্থিতি রয়েছে বলে প্রমাণ হবে। বিক্রিয়া না করলে তিনি আক্রান্ত নন বলে বিবেচিত হবে। ইতিমধ্যে এই ডট ব্লট পদ্ধতি ব্যবহার করে চায়না ও আমেরিকাতে কিট তৈরি করা হয়েছে। যেগুলো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে রয়েছে। এই কিট উৎপাদনে কাজ করেছেন ড. বিজন কুমার শিল, ড. নিহাদ আদনান, ড. মোহাম্মদ রঈদ জমির উদ্দিন এবং ড. ফিরোজ আহমেদ।

বর্তমানে আমাদের দেশে যে কিটে নতুন করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা করা হয়, সেটি মূলত ‘মলিকুলার’ টেস্ট কিট। এই পরীক্ষায় কিটে রোগীর নমুনা দিয়ে একটি মেশিনের মধ্যে রাখতে হয়। ঠিক যে পদ্ধতিতে হেপাটাইট ‘এ’ ‘বি’ ‘সি’ ভাইরাসের পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু ডট ব্লট পদ্ধতিতে সময় লাগবে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিট।

আরো দেখুন

Leave a Comment