১৫ মাসের জন্য বাংলাদেশে এসে ৫০ বছর পাড় করলেন যিনি

চট্টগ্রামের চন্দ্রঘোনায় চল্লিশ বছর আগে একটি পরিত্যক্ত গোডাউনে ৩-৪ জন রোগী নিয়ে যাত্রা শুরু করে সিআরপি। বিমান থেকে নেমেই চন্দ্রঘোনার সৌন্দর্যের প্রেমে পড়েন ব্রিটিশ একজন চিকিৎসক।

মাত্র ৩-৪ জন প্যারালাইজড রোগী নিয়ে যাত্রা শুরু হওয়া পক্ষাঘাতগ্রস্থদের পুনর্বাসন কেন্দ্র বা সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অফ দ্য প্যারালাইজড- সিআরপি’র। আর এখন বিভিন্ন স্থানে দৈনিক দুই শতাধিক রোগী সেবা নিচ্ছেন সিআরপি থেকে।

১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটির মূলে আছেন বাংলাদেশে বসবাসরত ব্রিটিশ ফিজিওথেরাপিস্ট যিনি জীবনের অধিকাংশ সময়ই বাংলাদেশে মানবসেবায় ব্যয় করেছেন। এখনও সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি হলেন ভ্যালেরি অ্যান টেইলর।

মাত্র ১৫ মাসের জন্য বাংলাদেশে এসে কাটিয়ে দেন ৫০ বছর বয়সী এই নারী চিকিৎসক। ১৯৭৯ সালে চন্দ্রঘোনার একটি মিশনারী হাসপাতালে আসেন ভ্যালেরি। সেখানে এসে বাংলাদেশের সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে ৫০ বছর কাটিয়ে দেন ব্রিটিশ এই চিকিৎসক।

এই প্রসঙ্গে তার স্মৃতিচারণা, আমি ভাবছিলাম পূর্ব পাকিস্তান আমার ভালো লাগবে না। ভাবলাম যখন আমি ১৫ মাসের জন্য যেতে পারবো তাহলে ২ বছরের জন্য কেন চুক্তি করবো? সুতরাং আমি ১৫ মাসের জন্যই চুক্তি করেছিলাম। ৫০ বছর পর এসে এখন মনে হচ্ছে আমি মনে হয় পরিকল্পনায় খুব একটা ভালো না।

ভ্যালেরি অ্যান টেইলর

আমি আর দুই জন ৪০ বছর আগে ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রামের চন্দ্রঘোনায় ৪০ বছর আগে একটি পরিত্যক্ত গোডাউনে ৩-৪ জন রোগী নিয়ে আমরা সিআরপি প্রতিষ্ঠা করি। বিমান থেকে নেমেই আমি চন্দ্রঘোনার সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে যাই। একটি দৃশ্য এখনো আমার মনে পড়ে- একদিন ঘনকুয়াশা ছিল।

আশে পাশে আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। হাঠৎ একটি সাম্পান আমার চোখে পড়ে মাঝি দাঁড় বাইছে। আর মনে হচ্ছে সাম্পানটি পানির ২-৩ ফুট উপর দিয়ে ভেসে চলছে। সেই দৃশ্য এখনো স্পষ্টভাবে আমার মনে ভাসে।

১৯৭৯ সালে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে সিআরপির কার্যক্রম শুরু করেন ভ্যালেরি। ১৯৯০ সালে সাভারে ৫৪ একর জায়গার উপর তৈরি করেন বর্তমান সিআরপি সেন্টার। বিভিন্ন কোর্সের মাধ্যমে প্রতি বছর ৪০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেয় সিআরপি। নানা কারণে পঙ্গুত্ববরণ করা অনেকের কর্মসংস্থানও হচ্ছে এখানে। বর্তমানে বাংলাদেশের ৫টি বিভাগে সিআরপির ১৩টি শাখা রয়েছে। বছরে সেবা নিচ্ছে ৮০ হাজার পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী।

নিজের উপলব্ধি থেকে ভ্যালরি বিবিসিকে বলেন, আমি নিশ্চিত দুর্ঘটনার পর অনেকেই মনে করে তাদের জীবন এখানেই শেষ। যখন তারা আমাদের বাস্কেটবল কোর্টের সামনে আসে ও দেখে। হুইলচেয়ারে বসে বাস্কেটবল খেলছে হুইলচেয়ারের উপর বল নিয়ে ঘুরছে বা বল আসর সাথে তারা ক্ষিপ্রতার সাথে থেমে যাচ্ছে। এটা তাদের মনোবল চাঙা করে যে, তারাও এটা করতে পারে।

ভ্যালেরি অ্যান টেইলর

কারণ এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যখন কেউ গ্রামে ফিরে যাবে তখন হুইলচেয়ারটা নষ্ট হলে সেখানে কেউ যেন সেটা সারাতে পারে। এটির যন্ত্রাংশগুলোও স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য হতে হবে। এই জন্য আমরা হুইলচেয়ারগুলোতে সাইকেল ও রিকশার বিভিন্ন পার্টস ব্যবহার করা হয় বলে ভ্যালরি জানান।

পঙ্গু রোগিদের নিজস্ব উদ্ভাবনে হুইলচেয়ার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি বানায় সিআরপি। ৭৫ বয়সী ভ্যালরি চান প্রতিষ্ঠানটির সাথে সম্পৃক্তরা এটিকে এগিয়ে নেবেন। এই জন্যই চালু করেছেন নতুন স্লোগান ‘‘ আমরাই সিআরপ’’।

তার ভাষায়, আমার স্বপ্ন এটা- আমরা যেন এই বার্তাটি ছড়িয়ে দিতে পারি যে, এটা শুধুমাত্র ফিজিওথেরাপি বা ভালো সার্জারি বা নাসিং কেয়ার করা না। আমরা আমাদের রোগিদের সম্মান দিচ্ছি কি না? আমার মনে হয় ৪০ বছর একটা দারুণ সময় নিজেকে এখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার। এবং যারা বলে আমিই সিআরপি তারা এটির মূল্যবোধকে সামনে এগিয়ে নেবে।

আরো দেখুন

Leave a Comment