হত্যা নয়, আত্মহত্যা করেছিলেন চিত্রনায়ক সালমান শাহ

দীর্ঘ ২৪ বছর পর নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ ’র মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)

সালমান শাহ হত্যা না আত্মহত্যা এ নিয়ে প্রায় আড়াই দশক ধরে চলা তদন্তের চূড়ান্ত অবসান ঘটিয়ে পিবিআই

সালমান শাহ আত্মহত্যাই করেছিলেন বলে জানায় পিবিআইল।

ধানমন্ডির পিবিআই সদর দফতরে সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন

প্রতিবেদনে সালমান শাহ’র আত্মহত্যার পেছনে পাঁচটি কারণ উল্লেখ করা হয়-

১. শাবনূরের সঙ্গে সালমানের অতিরিক্ত অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তার আত্মহত্যার অন্যতম কারণ

২. শাবনূরের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কের পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে স্ত্রী সামিরার সঙ্গে দাম্পত্য কলহ ছিল

৩. মায়ের প্রতি সালমানের ছিল অসীম ভালোবাসা

৪. জটিল সম্পর্কের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পুঞ্জিভূত আবেগ অভিমানে রূপ নিয়েছিলে

৫. সন্তান না হওয়ায় দাম্পত্য জীবনে অপূর্ণতাও ছিল

সব চাপ সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সালমান শাহ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ হত্যার শিকার হননি, পারিবারিক কলহের জেরে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা পিবিআই।

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সোমবার দুপুরে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন তুলে ধরেন পিবিআই প্রধান। আদালতের আদেশে মামলাটির তদন্তভার পায় সংস্থাটি।

বনজ কুমার বলেন, “পিবিআই’র তদন্তকালে ঘটনার সময় উপস্থিত ও ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ৪৪ সাক্ষীর জবানবন্দি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় লিপিবদ্ধ করা হয়। ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় লিপিবদ্ধ করা হয়। পাশাপাশি ঘটনা সংশ্লিষ্ট আলামত জব্দ করা হয়। এসব বিষয় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চিত্রনায়ক সালমান শাহ পারিবারিক কলহের জেরে আত্মহত্যা করেছেন। হত্যার অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।”

সুইসাইডাল নোট:

সালমানের আত্মহত্যার পক্ষে এসময় বেশকিছু তথ্য উপাত্তের কথাও জানানো হয় সংস্থাটির পক্ষ থেকে। এরমধ্যে একটি হলো সালমানের সুইসাইডাল নোট!

সিআইডি তদন্তকালে সামিরার কাছ থেকে এই সুইসাডাল নোটটি উদ্ধার করে। সেটি সালমানের প্যান্টের পকেট থেকে উদ্ধার করা হয়।’

সালমান সুইসাইডাল নোটে লিখেন, আমি চৌ. মো. শাহরিয়ার। পিতা কমরুদ্দীন আহমেদ চৌধুরী। ১৪৬/৫, গ্রীণ রোড ঢাকা #১২১৫ ওরফে সালমান শাহ। এই মর্মে অঙ্গিকার করছি যে- আজ অথবা আজকের পরে যে কোনো দিন। আমার মৃত্যু হলে তার জন্য কেউ দায়ী থাকবে না। সেচ্ছায়, স্বজ্ঞানে, সুস্থ মস্তিষ্কে আমি আত্মহত্যা করছি।’

ঘটনা প্রবাহ:

চলচ্চিত্রে জনপ্রিয়তার সর্বোচ্চ শিখরে থাকাকালে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার (ইমন) ওরফে সালমান শাহ। এ ঘটনায় তখন অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করে পুলিশ।

তবে সালমান শাহের বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী দাবি করেন, তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালের ১৪ জুলাই অভিযোগটি মামলা হিসেবে নেওয়ার আবেদন জানান কমরউদ্দিন।

অপমৃত্যু মামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আমলে নিয়ে বিষয়টি একসঙ্গে তদন্ত করার জন্য অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন আদালত।

১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। প্রতিবেদনে সালমান শাহের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে প্রতিবেদনটি গৃহীত হয়। সিআইডির সে প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে সালমান শাহের বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রিভিশন মামলা দায়ের করেন।

২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান আদালত। এরপর প্রায় ১৫ বছর মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে ছিল। ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকার সিএমএম আদালতের বিচারক বিকাশ কুমার সাহার কাছে বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক। এ প্রতিবেদনে সালমান শাহের মৃত্যুকে ‘অপমৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

২০১৪ সালের ২১ ডিসেম্বর সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরী ছেলের মৃত্যু নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নীলা চৌধুরী ঢাকা মহানগর হাকিম জাহাঙ্গীর হোসেনের আদালতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে নারাজির আবেদন দাখিল করেন।

নারাজি আবেদনে উল্লেখ করা হয়, আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ ১১ জন তার ছেলে সালমান শাহের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন।

এরপর মামলাটির তদন্তভার পায় র‌্যাব। র‌্যাবের তদন্ত আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ গত বছরের ১৯ এপ্রিল মহানগর দায়রা জজ আদালতে একটি রিভিশন মামলা করে। ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ-৬’র বিচারক ইমরুল কায়েস রাষ্ট্রপক্ষের রিভিশনটি মঞ্জুর করেন এবং র‌্যাবকে মামলাটি আর তদন্ত না করার আদেশ দেন। তারপর মামলাটির তদন্তভার পরে পিবিআই’র হাতে।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি এ মামলার পুনঃতদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করার কথা ছিল। পিবিআই ওই তারিখে প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় ঢাকা মহানগর হাকিম বাকী বিল্লাহ পুনঃতদন্ত প্রতিবেদনটি ১৮ মার্চ জমা দেওয়ার আদেশ দেন।

চিত্রনায়ক সালমান শাহ

তদন্ত প্রত্যাখ্যান সালমানের মায়ের:

একইদিন পিবিআই’র তদন্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন সালমানের মা নীলা চৌধুরী। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাজ্য থেকে টেলিফোনে গণমাধ্যমকে বলেন, এটা নাটকের মহড়া, শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা। সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদারের শারীরিক ভাষা (বডি ল্যাঙ্গুয়েজ) প্রশ্নবিদ্ধ ছিল বলেও অভিযোগ করেন সালমানের মা।

তিনি বলেন, পিবিআই’র তদন্ত বাংলাদেশের কেউ বিশ্বাস করবে না। সবাই প্রত্যাখ্যান করবে। প্রতিবেদনের বক্তব্য ডাহা মিথ্যা। সালমান আত্মহত্যা করতে পারে না। তাকে হত্যা করা হয়েছে। আর এ ঘটনায় সালমানের স্ত্রী সামিরা ও তার বাবা মা সম্পৃক্ত বলেও অভিযোগ করেন সালমানের মা।

এছাড়া আলোচিত আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের কথিত সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ার যে বক্তব্য এসেছে পিবিআই প্রতিবেদনে, সেটিও প্রত্যাখ্যান করেন সালমানের মা।

প্রতিবেদনের এ বক্তব্য পুরোপুরি মিথ্যা। সালমান যদি আত্মহত্যা করে থাকেন, তাহলে তো সামিরা ও শাবনূর দুজনেরই প্ররোচণার জন্য দায়ী হওয়ার কথা বলে মনে করেন তিনি।

প্রতিবেদনে ক্ষুব্ধ শাবনূর:

পিবিআইয়ের এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন অভিনেত্রী শাবনূর। তিনি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে। সেখান থেকে গণমাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

শাবনূর বলেন, কেন এখানে আমার নাম জড়ানো হচ্ছে জানি না। সালমান যদি আত্মহত্যাও করে, তাহলে আমার কারণে কেন করবে! একজন মৃত মানুষের সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে কথা বলাটা খুব বিশ্রী মনে হয়েছে। যারা আমার নাম জড়াচ্ছেন বা জড়ানোর চেষ্টা করছেন আমি তার ঘোর বিরোধিতা করছি।

আমি সবসময় যা বলেছি এখনো তাই বলবো, সালমান শুধুই আমার নায়কই ছিল। এর বাইরে সে আমাকে তার ছোট বোনের মতো আদর করতো। তাকে আমি ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করতাম।

একজন মৃত মানুষকে নিয়ে এত বছর পর এরকম বিশ্রী কথা বলার মনমানসিকতা খুব খারাপ দাবি করে শাবনূর আরও বলেন, ‘সালমানের স্ত্রীর সঙ্গেও আমার একটা ভালো সম্পর্ক ছিল। সালমানের স্ত্রী সব সময় আমাদের সঙ্গেই থাকত। প্রেমের সম্পর্কের কিছু একটা যদি হতো, এটা তখন সবাই বুঝতে পারত।

সামিরার বাবার সন্তোষ প্রকাশ:

সালমান শাহ’র শ্বশুর সাবেক ক্রিকেটার শফিকুল হক হীরা পিবিআই’র তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে মন্তব্য করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সালমানের মৃত্যুর ক্ষোভ পড়েছে সামিরা ও তার পরিবারের ওপর। পিবিআই’রক এ তদন্তের মাধ্যমে সে অভিযোগের অবসান হলো।

ডনের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ:

পিবিআইয়ের এই প্রতিবেদনে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সালমান হত্যা মামলার অন্যতম আসামি অভিনেতা আশরাফুল হক ডন। তিনি সোমবার দুপুরে জাগো নিউজকে বলেন, ‘আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। অবশেষে কলিজার বন্ধুকে হত্যার মিথ্যা অভিযোগ থেকে মুক্ত হলাম। আমি সবসময়ই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলাম।

২৪টা বছর বুকের ভেতর বন্ধু হত্যার মিথ্যা অপবাদ আমাকে নিয়ে ঘুরতে হয়েছে। আমার যে ক্ষতি হয়েছে তার পূরণ কিছুতেই হবে না। আমি ধৈর্য ধরে ছিলাম। সত্য কোনো দিন মিথ্যা হয় না। মিথ্যাকেও কোনো দিন জোর করে সত্যি বানানো যায় না।

সালমান শাহ ছিল আমার কলিজার বন্ধু। এটা এই ইন্ডাস্ট্রির সবাই জানে। তার মৃত্যুতে কিন্তু আমারই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হলো। নায়ক-ভিলেন হিসেবে আমাদের যে জুটি ছিল সেটি তরুণদের কাছে অনেক অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সালমান চলে যাওয়ার পর আমিও আর সিনেমায় তেমনভাবে নিয়মিত হতে পারিনি। তবু আমার ওপর বন্ধু খুনের মিথ্যা দায় চাপানো হলো। কত কষ্ট, জ্বালা-যন্ত্রণা আমি সয়েছি দীর্ঘ এই ২৪ বছর সেটা আমিই কেবল জানি।’

পিবিআইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ডন বলেন, ‘আইন যা বলে তার ওপর কারও কিছু করার নেই। সালমান হত্যার তদন্তের জন্য অনেক তদন্ত হয়েছে। সর্বশেষ পিবিআই তদন্ত করলো। তারা অনেক সময় কাজটি করেছে। আমাকেও ডেকেছিলেন দুই মাস আগে। গিয়েছি। জবানবন্দি দিয়েছি। সংশ্লিষ্ট সবাইকেই তারা তলব করা হয়েছে বলে শুনেছি। তার ভিত্তিতে এ আত্মহত্যার প্রতিবেদন এলো। আমি দেশের আইন ব্যবস্থা এবং পিবিআইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। সুষ্ঠু-সুন্দরভাবে দুই যুগ ধরে চলে আসা একটি রহস্যের মীমাংসা তারা করেছেন।’

এই অভিনেতা আরও বলেন, ‘সালমান শাহ এ দেশের মানুষের কাছে একটি আবেগের নাম। মৃত্যুর এতগুলো বছর পেরিয়েও সে সবার কাছে জীবন্ত। আমি বহুবার ভেবেছি যদি এমন হতো মীরাকল ঘটে গেছে একটা। সালমান ফিরে এসেছে। আবার দুজন সিনেমা করতাম। এ দেশের মানুষ জানতো সালমান আমাকে কতোটা ভালোবাসে।

কিন্তু এই তো কেবলই কল্পনা। সালমান আসেনি, আসবেও না। আমার বন্ধুকে যেন আল্লাহ ওপারে ভালো রাখে সেই দোয়া চাই সবার কাছে।’

আরো দেখুন

Leave a Comment