সুপার ফুড কিনোয়া সম্পর্কে আপনি কতটা জানেন?

সুপার ফুড কিনোয়া সম্পর্কে আপনি কতটা জানেন?

ইসরাত জাহান পুষ্পিতা: কিনোয়া। অনেকে আবার কিনুয়া বলে ডাকেন। আমজনতা এটির নাম না শুনলেও ফিটনেস ফ্রিকরা এর খবর খুব ভালোভাবেই রাখেন। পাড়ার মুদির দোকানে না পাওয়া গেলেও যে কোনও শপিংমলের ফুড য় সেকশনে অবশ্যই দানার মতো কিনোয়ার দেখা মেলে।

দাম একটু বেশি তবে গুণও তো নেহাত কম নয়। তাই হেলদি ডায়েটে ক্রমশই জায়গা করে নিচ্ছে দানাদার এ খাবারটি। শস্য দানার মতো দেখতে কিনোয়া আসলে বীজ। স্পিন্যাচ বা পালং শাক পরিবারেরই সদস্য।

ফ্যাট কমাতে ইদানীং বাঙালি ওটস, ডালিয়ায় পেট ভরাচ্ছে। কারণ, এই খাবারগুলো কার্বোহাইড্রেট কম, রয়েছে হাই ফাইবার আরও নানা পুষ্টিগুণ। তবে গুণপণায় সমস্ত কিছুকেই ছাপিয়ে যায় কিনোয়া।

কিনোয়া হলো হাই প্রোটিন সম্পন্ন খাবার। এটিকে সুপার ফুডও বলা হয়। কিনোয়া অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে এবং লাইসিন সমৃদ্ধ, যা সারা শরীর জুড়ে স্বাস্থ্যকর টিস্যু বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

কিনোয়া আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন ই, পটাসিয়াম এবং ফাইবারের একটি উৎকৃষ্ট উৎস। রান্না করা হলে এর দানাগুলো আকারে চারগুণ হয়ে যায় এবং প্রায় স্বচ্ছ হয়ে যায়।

ডালিয়া, ওটসের চেয়েও কম কার্বোহাইড্রেট রয়েছে কিনোয়ায়। আছে উচ্চমাত্রার প্রোটিন, প্রচুর ফাইবার ও খনিজ আর ঠিক সেই কারণেই পুষ্টিবিদরা কিনোয়াকে সুপার ফুড বলছেন।

কিনোয়ার ইতিহাস: 

৫ হাজার বছর আগে ইনকা সভ্যতার সময় কিনোয়া খাওয়া শুরু হয়। সাউথ আমেরিকার অ্যান্ডেস মাউন্টেনে এই গাছ হত। তিন থেকে নয় ফুট লম্বা হয় কিনোয়া গাছ। এর পাতাও পালং শাকের মতো খাওয়া হয়। আর দানা হল সুপার ফুড।

সাধারণত তিন ধরনের দানা মেলে কিনোয়ার। সাদা, কালো ও লালচে ধরনের। ইনকাদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র খাবার কিনোয়া ছিল মাদার অফ অল গ্রেনস।

পু্ষ্টিগুণের জন্য ২০১৩ সালকে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক কিনোয়া বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছিল।

কিনোয়ার স্বাস্থ্য উপকারীতা:

চিকিৎসকরা বলছেন, ওজন যাঁরা কমাতে চান তাঁদের জন্য অত্যন্ত উপযোগীতো বটেই কিনোয়া ডায়াবেটিক রোগীদের জন্যও অত্যন্ত ভালো অপশন। কারণ কিনোয়াতে কার্বোহাইড্রেট অন্য খাবারের তুলনায় খুব কম মেলে। আর তা তৈরিতেও সময় লাগে।তাই ডায়াবেটিক রোগীরা তাঁদের ডায়েটে কিনোয়া রাখতেই পারেন।

কিনোয়া যেভাবে খায়:

  • খিচুড়ি, অমলেট, পোহা, উপমা, পোলাও, রুটি, বড়া যে কোনও ভাবেই কিনোয়া খাওয়া যায়।
  • কিনোয়া বীজ শুকনো কড়াইতে নাড়িয়ে মিক্সিতে গুঁড়িয়ে আটার সঙ্গে মিশিয়ে রুটি করে খাওয়া যায়।
  • কিনোয়া সারা রাত ভিজিয়ে রেখে নরম হয়ে গেলে ডিমে ফেটিয়ে অমলেট বানাতে পারেন।
  • সবজি দিয়ে খিচুড়ি তখাওয়া যায়
  • স্যালাডও খাওয়া যায় কিনোয়ার।

পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ:

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো উত্তর আমেরিকার ফসল কিনোয়ার চাষাবাদ শুরু হয়েছে। শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ বছরের গবেষণা শেষে মাঠ পর্যায়ে পাঁচটি প্লটে নতুন ফসলটির চাষ করা হয়েছে।

এর মধ্যে লালমনিরহাটে দুটি, কুড়িগ্রামে একটি ও পটুয়াখালীতে দুটি প্লট আছে। লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের তিনটি প্লটে জমি আছে ৭০ শতাংশ। তিনটি প্লটেই আশানুরূপ উৎপাদন হয়েছে।

দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন (২২ মার্চ-২০২১) অনুযায়ী, লালমনিরহাট সদর উপজেলার চিনিপাড়া গ্রামের কৃষক ইসরাইল হোসেন জানান, ‘আমি কিনোয়া ফসল সম্পর্কে জানতাম না। একটি বেসরকারি কোম্পানির কৃষিবিদ ইকবাল হাসানের পরামর্শে ২৫ শতাংশ জমিতে কিনোয়া চাষ করেছি। কিনোয়া চাষ করতে আমার খরচ হয়েছে ১৩ হাজার টাকা। আশা করছি ২৫ শতাংশ জমি থেকে ৮০-৯০ কেজি ফলন পাব।’

লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়ুয়া গ্রামের কৃষক মুকুল কুমার রায় জানান, ‘আমিও ইকবাল হাসানের পরামর্শে ২৫ শতাংশ জমিতে কিয়ানা চাষ করেছি। তার কাছ থেকে বীজ সহায়তা পেয়েছি এবং তিনি এই ফসলের চাষ পদ্ধতি দেখিয়ে দিয়েছেন। কোনো রাসায়নিক সারের ব্যবহার ছাড়াই জৈব সার ব্যবহার করে এই ফসলের চাষ করেছি। ফলন আশানুরূপ হয়েছে। মার্কেট সুবিধা পেলে আগামীতে বেশি জমিতে এ ফসল চাষ করব।’

বেসরকারি কোম্পানির কৃষিবিদ ইকবাল হাসান জানান, ‘প্রতি শতাংশ জমিতে কিনোয়া চাষ করতে খরচ হয় ৫০০-৬০০ টাকা আর উৎপাদন হতে পারে ৪-৬ কেজি। আমি ব্যক্তিগতভাবে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনজন কৃষককে দিয়ে কিনোয়া চাষ করেছি পাইলটিং হিসেবে। ফলাফল খুবই সন্তোষজনক।’

তিনি আরও জানান, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে কিনোয়ার ব্যাপক চাহিদা আছে। তবে, বাংলাদেশে এখনো সেভাবে মার্কেট গড়ে ওঠেনি। রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে কিনোয়ার চাহিদা আছে। বাংলাদেশে ভোক্তাদের অগ্রিম চাহিদা দিয়ে আমদানিকৃত প্রতি কেজি কিনোয়া কিনতে হচ্ছে ১৬০০ টাকা দরে।’

চাষ সম্ভব খরা প্রবণ ও লবণাক্ত উভয় জমিতেই: 

ঢাকা শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রোনমির প্রফেসর ড. পরিমল কান্তি বিশ্বাস জানান, “আমি পাঁচ বছর গবেষণার পর পাইলটিং করতে মাঠ পর্যায়ে কিনোয়া চাষ শুরু করেছি। ফলাফলও আশানুরূপ। আমার আবেদনের পর ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে কিনোয়া চাষের অনুমোদন দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। খরা প্রবণ ও লবণাক্ত দুই ধরনের জমিতেই কিনোয়া চাষ সম্ভব। নভেম্বরের মাঝামাঝি এ ফসল চাষ করে মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে মাঝামাঝি সময় ফলন ঘরে তোলা যায়।”

“বাংলাদেশে কিনোয়ার মার্কেট তৈরি হলে দেশের কৃষক কিনোয়া চাষ করে লাভবান হতে পারবেন। দেশে কিনোয়ার মার্কেট তৈরিতে কাজ চলছে। উৎপাদিত কিনোয়া বিদেশেও রপ্তানি করা যেতে পারে।”বলে মনে করেন এ অধ্যাপক।

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামীম আশরাফ জানান, “লালমনিরহাটে কিনোয়ার চাষ শুরু হওয়ার বিষয়টা আমরা জানতে পেরেছি। শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এটি নিয়ে গবেষণা করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে চাষাবাদ শুরু করেছে।”

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *