সারাদেশে এখন সিনেমা হলের সংখ্যা ৭০ টি

সিনেমা হল

নব্বাই দশকে দেশের বাংলা সিনেমা তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে সালমান শাহ এর নিপুণ অভিনয় এদেশের দর্শকদের হলমুখী করে তুলে। সালমান শাহের ক্যারিয়ারের ৩ বছর ছিল ঢালাই সিনেমার স্বর্ণ যুগ। এ সময়ের মধ্যে কোনো ছবি ফ্লপ যায়নি।

সালমান শাহের মৃত্যুর পরেও সিনেমা পাগল লোকেরা হলে গিয়ে সিনেমা দেখে বিনোদন নিতেন। ধীরে ধীরে তার উপর ভাটা পড়তে থাকে। দু-তিন বছর আগেও সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল ২৫০। দেশে সচল সিনেমা হলের সংখ্যা কমতে কমতে এখন ৭০ এ ঠেকেছে।

নব্বইয়ের দশকে সারাদেশে ১ হাজার ৪৩৫টির মতো সিনেমা হল সচল ছিল, সেখানে এখন আছে কেবল ৭০টি! এখন দেশের অনেক জেলা শহরে কোনো সচল সিনেমা হল-ই নেই।

বরগুনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, নড়াইল, নাটোর, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, পঞ্চগড়, ব্রাক্ষণবাড়িয়া, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, চুয়াডাঙ্গা, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, বান্দরবানসহ দেশের ২৫টি জেলায় বর্তমানে সচল কোনো সিনেমা হল নেই।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির উপদেষ্টা মিয়া আলাউদ্দিন এক গণমাধ্যমের সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানিয়েছেন।

প্রযোজক, পরিবেশক ও প্রদর্শক সমিতির কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সাল পর্যন্ত টাঙ্গাইলে ৪৭টি সিনেমা হল থাকলেও এখন সেখানে মাত্র ১০টি হল সচল রয়েছে।

যশোরে ২১টি সিনেমা হল থাকলেও এখন মাত্র চারটি সিনেমা হল চালু রয়েছে। অন্যদিকে সিরাজগঞ্জ জেলার ৩১টি সিনেমা হলের মধ্যে রয়েছে মাত্র পাঁচটি।

একই চিত্র রাজধানী ঢাকাতেও। গুলিস্তান, নাজ, মুন, মুকুল, সদরঘাটের রূপমহল, আরমানিটোলার শাবিস্থান, পোস্তগোলার ডায়না, কারওয়ান বাজার এলাকায় পূর্ণিমা ও কাকরাইলের রাজমণি ও রাজিয়া সিনেমা হলও বন্ধ হয়ে গেছে।

সিনেমা হলগুলো বন্ধ হওয়ার পেছনের কারণ হিসেবে সিনেমা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভালো সিনেমা নেই বলে হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কেউ আবার বলছেন, হল নেই বলেই সিনেমার ব্যবসা খারাপ। তাই ভালো সিনেমাও নির্মিত হচ্ছে না।

সবমিলিয়ে বাস্তব চিত্র হচ্ছে, ক্রমশই দেশের সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যা দেশের সিনেমার জন্য শঙ্কার বিষয়। যে ৭০টি সিনেমা হল এখনও সচল রয়েছে, সেগুলোও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।

প্রদর্শক সমিতির সভাপতি ও প্রযোজক ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বলেন, “দু-একটা ছবি যে বছরে ব্যবসা করছে না, তা বলছিনা। কিন্তু, এতে কি সিনেমা হল টিকে থাকবে? বাংলাদেশের সিনেমা এখন লাইফ সাপোর্টে আছে। আর যদি দিনকে দিন হলের সংখ্যাও কমতে থাকে, তাহলে বিশাল সংকটে পড়তে হবে। এক সময় দেশে হলই থাকবে না।”

পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, “সিনেমা চালিয়ে এখন হল মালিকরা লাভবান হতে পারছেন না। তাই হল ভেঙ্গে মার্কেট বানাচ্ছেন বা অন্য ব্যবসা করছেন। হল না থাকলে সিনেমা কীভাবে দেখবে মানুষ? তাই যেকোনোভাবেই হোক সিনেমা হল টিকিয়ে রাখতে হবে।”

এদিকে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ দেশের সিনেমা হলগুলো রক্ষার জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সিনেমা হলগুলো যদি টিকে থাকে তবে চলচ্চিত্র শিল্প ও শিল্পীরা বেঁচে থাকবে।

১৮ ফেব্রুয়ারি-২০২০ সচিবালয়ে তার কার্যালয়ের সভাকক্ষে চলচ্চিত্র শিল্পের সাথে যুক্ত বিভিন্ন অংশিজনদের সাথে এক বৈঠকে তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনা এবং বৈশ্বিক সিনেমা বাজারে দখল নেয়া।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতি (বিএফপিডিএ), বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি (বিএফডিএ) এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির (বিএফইএ) কার্যনির্বাহী সদস্যরা অংশ নেন। সভায় তথ্য সচিব কামরুন নাহারও বক্তব্য রাখেন।

হাছান মাহমুদ বলেন, আমাদের চলচ্চিত্র জগতের দুঃসময় শেষ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কয়েকটি ভালো ও মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।

চলচ্চিত্র শিল্পকে ‘বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন মিডিয়া’ হিসাবে অভিহিত করে হাছান তথ্যমন্ত্রী বলেন, ১৯৫৭ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে এই শিল্পের যাত্রা শুরু হয়।

জনগণ সিনেমা হলগুলোতে যাওয়া বন্ধ করে দেয়ার কারণে সারাদেশে অনেক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সিনেমা হল রক্ষায় সবাইকে একযোগে কাজ করা উচিৎ।

হাছান মাহমুদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তত্ত্বাবধানে বর্তমান সরকার এই শিল্পকে প্রাণবন্ত করার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সিনেমা হল মালিকদের জন্য সহজ ও দীর্ঘমেয়াদী ঋণের জন্য আমি ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছি।

মন্ত্রী বলেন, দেশে সিনেমা হল বন্ধ হওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পকে রক্ষা করা দরকার। আর চলচ্চিত্র শিল্পকে রক্ষার প্রধান উপাদান হলো সিনেমা হল।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য অনুদানের পরিমাণ পাঁচ কোটি থেকে বাড়িয়ে ১০ কোটি টাকা করেছে এবং অনুদানের জন্য এখন একটি নীতিমালা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রস্তাবিত নীতিমালা অনুযায়ী অনুদানের অর্থে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো সিনেমা হলে মুক্তি দিতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি চলচ্চিত্র নির্মাতার অনুদানের পরিমাণও বাড়িয়ে ৭৫ লাখ করা হয়েছে বলেও মন্ত্রী জানান।

সিনেমা হল মালিকদের আশ্বাস দিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, সমস্যা সমাধানের জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাথে তিনি কথা বলবেন। মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, চলচ্চিত্র শিল্প তার অতীত ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করবে এবং বাংলা সিনেমা বিশ্বব্যাপী বাজার দখল করবে।

সভায় বক্তব্য রাখেন বিএফপিডিএ সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু, বিএফডিএ সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার, বিএফইএ সভাপতি কাজী শোয়েব রশিদ এবং বিএফইএর প্রধান উপদেষ্টা সুদীপ্ত কুমার দাস প্রমুখ।

আরো দেখুন

Leave a Comment