বিশ্বের শীর্ষ ৯ ধনীকে গরীব বানালো করোনা ভাইরাস !

করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ প্রকোপ বিশ্ববাসীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেই চলছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও স্টক মার্কেটের দরপতনের কারণে শীর্ষ ধনীদের সম্পদের হেরফের ঘটে থাকে।

তাদের সম্পদ ও বিনিয়োগের পরিমাণ এত বেশি যে সূচকের সামান্য ওঠানামাই বড় পরিমাণ সম্পদের ক্ষয়-বৃদ্ধি ঘটায়।

করোনাভাইরাসের প্রভাবেও সেটিই ঘটেছে। তবে, এটি নিকট অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। এই পরিস্থিতি অবশ্য একেবারেই নতুন-তা বলা যাবে না

ব্ল্যাক মানডে:

১৯৮৭ সালের ১৯ অক্টোবর ভয়াবহ এক ধসের মুখে পড়ে বৈশ্বিক পুঁজিবাজার। বিশ্বের বড় শেয়ারবাজারগুলোতেও সেদিন ধস নামে। সেই কথাই স্মরণ করে দিয়েছে বিশ্বের নামকরা সাময়িকী ফোর্বেস।

ওইদিন সোমবার থাকায় ইতিহাসে দিনটিকে ‘ব্ল্যাক মানডে’হিসেবে স্মরণ করা হয়। সেই ব্ল্যাক মানডেরই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে ৯ মার্চ-২০২০ সালে। কাকতালীয় হলেও সত্য এ দিনটিও সোমবার দিন ছিল।

সৌদি-রাশিয়ার জ্বালানি মূল্যযুদ্ধ:

একদিকে বিশ্বজুড়ে করোনার ভয়াবহ হানা অন্যদিকে জ্বালানির বাজারে সৌদি আরব ও রাশিয়ার মধ্যে  আচমকা মূল্যযুদ্ধ এ দুয়ের যুগপৎ সংক্রমণে টালমাটাল হয়ে পড়েছে বৈশ্বিক শেয়ার বাজার।

বিশ্বজুড়ে তোলপাড় তুলে দেওয়া করোনাভাইরাস প্রাণহানির পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতির অনেক হিসাবনিকাশ পাল্টে দিয়েছে।

বিমানে ফ্লাইট বাতিল থেকে শুরু করে শেয়ারবাজারে ধস— কী হয়নি? এর প্রভাবে সম্পদ কমেছে বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের। আর তার মূল্য ৩ হাজার ৭৭০ কোটি ডলার!

বিশ্বের শীর্ষ ১০ বিলিয়নিয়ারের ৯ জনই সম্মিলিতভাবে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের সম্পদ হারিয়েছেন।

সম্পদ হারানো ধনকুবেররা

বার্নার্ড আরনল্ট:

টাকার অঙ্কে ও হারে সবচেয়ে বেশি সম্পদ কমেছে বিলাসবহুল পণ্য নির্মাতা বার্নার্ড আরনল্টের। একদিনে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার নেই হয়ে গেছে তার!

যা তার মোট সম্পদমূল্যের ৬ শতাংশ। তিনি প্যারিসভিত্তিক এলভিএমএইচের প্রধান নির্বাহী ও বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ ধনী। এছাড়া তিনি ইউরোপের সবচেয়ে ধনকুবের ব্যক্তি।

বিলাসী পণ্যের বিখ্যাত কোম্পানি এলভিএমএইচ বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ সম্পদশালী কোম্পানি। ৯ মার্চ-২০২০ এ পুঁজিবাজারে একদিনেই তার সম্পদমূল্য কমেছে ৬০০ কোটি ডলার, যা তার মোট সম্পদের প্রায় ৬ শতাংশ।

জেফ বেজোস:

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস। এদিন অন্যান্য ধনকুবেরদের মতো বেজোসের সম্পদমূল্যও কমেছে।

সোমবার দিন শেষে বিশ্বের শীর্ষ ধনী ও আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের সম্পদমূল্য কমেছে ৫৬০ কোটি ডলার। এর আগের সপ্তাহেই সম্পদ কমেছিল ১ হাজার ৪১০ কোটি ডলার। আর আমাজনের শেয়ারমূল্য কমেছে ৫ শতাংশের বেশি।

ওয়ারেন বাফেট:

ব্ল্যাক মানডের প্রভাব থেকে বাঁচতে পারেননি বিশ্বের সবচেয়ে সফল বিনিয়োগকারী ও বিনিয়োগ গুরু ওয়ারেন বাফেট। এদিন শত কোটি ডলার সম্পদ হারিয়েছেন তিনি। কিংবদন্তি এ বিনিয়োগকারীর কোম্পানি বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের শেয়ার দর বছরের সর্বনিম্নে নেমে আসে।

তার সম্পদ কমেছে ৫৪০ কোটি ডলারের। আগেই বিষয়টি আঁচ করতে পেরে কিনা দুই সপ্তাহে আগে বাফেট করোনাভাইরাসকে মার্কিন অর্থনীতির সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে মন্তব্য করেছিলেন।

করোনার প্রকোপ পড়া ধনীদের সম্পদ গ্রাফে দেখানো হলো

কার্লোস স্লিম:

সম্পদ হারানোর দিক থেকে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছেন মেক্সিকান টেলিকম কোম্পানি টেলিমেক্সের সিইও কার্লোস স্লিম।

বিশ্বের অষ্টম শীর্ষ ধনী স্লিম ও তার পরিবার এদিন ৪৮০ কোটি ডলার সম্পদ হারিয়েছেন যা তার মোট সম্পদের ৮ শতাংশ।

আমানসিও ওরতেগা:

সম্পদ হারানোর দিক থেকে পঞ্চম স্থানে রয়েছেন ফ্যাশন কোম্পানি জারা’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও আমানসিও ওরতেগা। ব্ল্যাক মানডেতে ২৮০ কোটি ডলার তিনি সম্পদ হারিয়েছেন তিনি।

ফ্যাশনের জগতে জারার খ্যাতি বিশ্বজোড়া। জারার চেইন ফ্ল্যাগশিপ স্টোরগুলো পরিচালনা করে ইনডিটেক্স ফ্যাশন গ্রুপ, যার সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও আমানসিও ওরতেগা। বার্নার্ড আরনল্টের পর ইউরোপের শীর্ষ ধনী তিনি।

ল্যারি পেজ:

গুগলের প্যারেন্ট কোম্পানি অ্যালফাবেটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান নির্বাহী ল্যারি পেজ গত সোমবার সম্পদ হারিয়েছেন ৩৩০ কোটি ডলার।

মার্ক জাকারবার্গ:

ফেসবুকের সহপ্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও সিইও মার্ক জাকারবার্গ এদিন ৪২০ কোটি ডলার সম্পদ হারিয়েছেন। এর এক দিন পরেই করোনা মোকাবিলায় কোটি ডলার সহায়তার ঘোষণা দেন।

বিল গেটস:

মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও বিল গেটস ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান বিল গেটসের সম্পদ করেছে ৩৮০ কোটি ডলার। করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় তার ফাউন্ডেশন ১০ কোটি ডলার অনুদানের ঘোষণা দিয়েছে।

প্রত্যেক বছরই তাদের মধ্যে সম্পদের উঠানামা করে

সাধারণত স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করে থাকেন তিনি। এই কারণে হয়তো কোপটা তুলনামূলক কম পড়েছে গেটসের ওপর মনে করেন অনেকে।

শুক্রবার মাইক্রোসফটের পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন গেটস। নিজ হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাড়ে চার দশকের সম্পর্কের ইতি টেনে আপাতত মানবকল্যাণে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের কাজে মনোযোগ দিতে চান তিনি।

গত মাসের শেষ দিকে প্রাণঘাতী করোনার মোকাবেলায় তার ও স্ত্রী মেলিন্ডা গেটসের নামে গড়া ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ১০ কোটি ডলার প্রদানের ঘোষণায় পরই করোনাভাইরাস হয়তো এরই প্রতিশোধ নিয়েছে, একদিনে তার কোটি ডলারের সম্পদ কেড়ে নেয়ার মাধ্যমে এমন মন্তব্য করেছেন নেটিজেনরা।

ল্যারি এলিসন:

ব্ল্যাক মানডেতে মার্কিন কম্পিউটার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওরাকল করপোরেশনের শেয়ারের দাম কমে ৩ শতাংশ। এতে ১৮০ কোটি ডলার সম্পদ হারিয়েছেন কোম্পানিটির চেয়ারম্যান ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ল্যারি এলিসন।

মাইকেল ব্লুমবার্গ:

শীর্ষ ১০ বিলিয়নেয়ারের মধ্যে কেবল মাইকেল ব্লুমবার্গই নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করতে পারেন। ব্ল্যাক মানডের কারণে একমাত্র তাকেই সম্পদ হারাতে হয়নি।

কারণ তার মালিকানাধীন ম্যানহাটনভিত্তিক আর্থিক, সফটওয়্যার, ডাটা ও মিডিয়া কোম্পানি ব্লমবার্গ শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত নয়।

আরো দেখুন

Leave a Comment