শান্তির প্রতীক অং সান সু চি কেন ভিলেন?

শান্তি ও মানবাধিকারের প্রতীক হিসেবে সকলেই তাকে চিনতেন। যে নারী বিশ্বের সবার কাছে পরিচিতি পেয়েছিলন সুপার হিরোইন হিসেবে। আজ তিনি সবার কাছে ঘৃণার পাত্রী।

মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি শান্তিতে নোবেলও পেয়েছেন। তিনি এখন মিয়ানমারের বেসামরিক নেতা। তার চোখের সামনে গণহত্যা চালানোর পরও সেনা বাহিনীর পক্ষে সাফাই গাইছেন।

মিয়ানমারের গণতন্ত্রী নেত্রী অং সান সু চির এমন অবিশ্বাস্য আচরণ গোটা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছে। ইয়াঙ্গুন শহরের একটি বাড়িতে সেনা বাহিনী প্রায় ২০ বছর তাকে গৃহবন্দি করে রেখেছিল।

মানবতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সেই সেনা বাহিনীর পক্ষ নিয়ে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ ও নিন্দার জন্ম দিয়েছেন
সেই তিনিই।

জাতিসংঘের তদন্ত কমিটি বলছে, ‘’ গণহত্যার প্রবণতা ‘’ থেকে মিয়ানমার সেনা বাহিনী রোহিঙ্গাদের টার্গেট করে হত্যা করেছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনা বাহিনীর সশস্র হামলায় ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হয়

রোহিঙ্গাদের উপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যাযজ্ঞ। লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তে আশ্রয় নেয়

পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম দেশ গাম্বিয়া জাতিসংঘর সর্বোচ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিজ- আইসিজেতে মামলা দায়ের করে। আরো কয়েক ডজন মুসলিম দেশ গাম্বিয়াকে সমর্থন ও সহায়তা করে। আন্তর্জাতিক ইসলামী সহযোগী সংস্থা ওআইসি ও সৌদি আরব তার মধ্যে অন্যতম।

মুসলিম দেশগুলো আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের উপর চালানো নির্যাতন বন্ধ চান। বার বার বিভিন্ন দেশ থেকে সুচিকে অবহিত করা হলেও তা আমলে নেননি সু চি সরকার।

গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমার সেনা বাহিনী। রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে তারা জাতিগত নিধন চালায়। সু চিও সেনাদের সুরে সুর মিলিয়ে একই কথা বলছেন। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা নির্যাতন শুরু হলে গণমাধ্যমে সু চি কিছু বলেননি। অনেকটা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন।

দুই মাস পরে বিবিসিকে তিনি বলেন, আমি মনে করি না মিয়ানমারে জাতিগত নিধন হচ্ছে। জাতিগত নিধন আরো ব্যাপক ও বিস্তৃত বিষয়।

এরপর তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে গণহত্যার দায়ে একজন অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন

২০১৯ সালের নভেম্বরে সু চি বলেছেন, রাখাইনে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করা হয়েছে তবে জাতিগত নিধন করা হয়নি। যারা রাখাইনে শান্তি চান না তাদের দমন করা হয়েছে

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বিব্রত হন সু চি। এবং শান্তি পুরস্কার সহ সব পুরস্কার ফিরিয়ে নেন বিশ্বনেতারা।

এখন তিনি প্রকাশ্যেই কেন সেনাদের পক্ষ নিয়েছেন?

ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসির মিয়ানমার করেসপডেন্ট নিক বিকের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, স্থানীয়রা বলছেন, দেশ বা সেনা বাহিনীকে নয়, নিজের অবস্থান শক্ত করতে সেনাদের পক্ষ নিয়েছেন সু চি।

সাংবিধানিকভাবে সামরিক বাহিনীর উপর নিজের নিয়ন্ত্রণের জন্যই সু চির এই পদক্ষেপ। সু চিকে সেনা বাহিনী গৃহবন্দি করলে মিয়ানমারের লোকেরা না ভুললেও ভুলে গেছেন সু চি

মিয়ানমার বৌদ্ধ রাষ্ট্র হওয়ায় রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিয়ে তারা বিব্রত অথবা মুসলিমদের সরাসরি তারা অবজ্ঞা করছেন

দেশের জান্তাদের প্রতি এমন মায়াকে নির্বাচনী কৌশল মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।২০২০ সালের নভেম্বরে মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে সেনাদের পক্ষ নেওয়ায় দেশে তার জনপ্রিয়তা অনেক বেড়েছে

নিক বিকের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা নির্যাতনের জন্য বিচারের প্রক্রিয়া আরো অনেক দেরি। আন্তর্জাতিক আদালতও সহসা কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারছে না

আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে আইসিজে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জোরালভাবে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে না বা কিছু বলতেও পারবে না।

আন্তর্জাতিক পুলিশ বাহিনীও নেই যে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন থেকে বাঁচাতে পারে। সু চি বা শীর্ষ পদের জেনারেলদের সহজেই গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করাও যাবে না

মিয়ানমারের সেনা বাহিনীকে শায়েস্তা করতে একমাত্র পথ হচ্ছে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা। তাতে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙ্গে পড়বে। এটাই রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার সবচেয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ।

অকল্পনীয় গণহত্যার অপরাধকে সাফাই দিয়ে নিজেকে রক্ষার পথ বেছে নিয়েছেন সু চি। নিজ দেশে জনপ্রিয়তার জন্য এক সময়ের মানবতার বাতিঘর, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থন পাওয়া সু চি অমানবিক সেনাদের পক্ষ নিয়ে বিশ্ব মানবতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যাচ্ছেন।

নিজের স্বার্থের জন্য মানুষ কতটা স্বার্থপর হতে পারে তা বিশ্ব নেতাদের বুঝিয়ে দিলেন এক সময়ে গণতন্ত্রের নেত্রী অং সান সু চি। সু চির অমানবিকতার কথা যুগ যুগ ধরে স্মরণ রাখবে মানুষ।

আরো দেখুন

Leave a Comment