শরণার্থী কোন দেশে কতজন?

সাম্প্রতিককালে শরণার্থী সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। সংঘর্ষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিভিন্ন প্রতিকূলতার শিকার হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিচ্ছেন বহু দেশের নাগরিক। তবে অতীতেও মানুষ বিভিন্ন কারণে শরণার্থী হয়েছিল।

আয়ারল্যান্ডে যুদ্ধের সময় অনেক আইরিশ যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপদ জীবনের আশায় আশ্রয় নেন। কিউবায় যখন ফিদেল কাস্ত্রো সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় লড়াই করছিলেন তখন অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পাড়ি জমান।

ইউরোপের বলকান অঞ্চল, দক্ষিণ সুদানের যুদ্ধ, সিরিয়া যুদ্ধ, আফগানিস্তানের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, কঙ্গো, সোমালিয়া, তিউনিশিয়া, নাইজেরিয়া ও ইরিত্রিয়ায় দুর্ভিক্ষ ও সাংঘর্ষিক পরিবেশ এ অঞ্চলের মানুষদের বাধ্য করেছে অন্য দেশে পাড়ি জমাতে।

আশ্রয় দেয়া দেশের সরকার, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা এই শরণার্থীদের বিভিন্ন ধরণের সহযোগিতা করে থাকে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএসএইচসিআর।

ইউএনএইচসিআরের ২০১৮ সালের তথ্যমতে, শরণার্থীদের ৭০ ভাগই সিরিয়া, আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান, মিয়ানমার ও সোমালিয়া এ পাঁচ দেশের নাগরিক। তারা বেশির ভাগই প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে।

সিরীয় শরণার্থীরা সিংহভাগই এখন তুরস্কে। আফগান শরণার্থী অর্ধেকের বেশি পাকিস্তানে। দক্ষিণ সুদানের অনেক শরণার্থী হয় সুদান নয়তো উগান্ডায় আশ্রয় নিয়েছে। আর মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে।

আধুনিক এই যুগে সবচেয়ে বেশি শরণার্থী আশ্রয় দিয়েছে ইউরেশিয়ার দেশ তুরস্ক। ৪০ লাখ শরণার্থী নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শরণার্থীকে আশ্রয়দাতা দেশ তুরস্ক।

শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার ক্ষেত্রে উদারতার পরিচয় দিয়েছে জার্মানিও। জার্মানিতে প্রায় ১৩ লাখ শরণার্থী রয়েছে। এদের মধ্যে ৫ লাখের বেশি সিরীয় শরণার্থী। আফগান শরণার্থী রয়েছে প্রায় ২ লাখ। বাকিরা এসেছে ইরাক, ইরিত্রিয়া, ইরান থেকে।

জর্ডানেও রয়েছে ১২ লাখ শরণার্থী। প্রতিবেশী দেশ সিরিয়া থেকে এসেছে প্রায় ৭ লাখ। জর্ডানে জনসংখ্যার তুলনায় শরণার্থী একটু বেশিই। সেখান প্রতি ছয়জনে একজন শরণার্থী। অর্থাৎ জনসংখ্যার ২০ ভাগই শরণার্থী।

শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্ববাসীর আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ। মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে তাদের আশ্রয়কাল চার বছর পার হয়েছে।

এই বিপুল জনসংখ্যা স্থানীয় মানুষের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করছে। রোহিঙ্গাদের চাপে টেকনাফ ও উখিয়ায় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। রোহিঙ্গাদের অনেকেই নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

২০০৭ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় সাত লাখ বার্মিজ শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে। তবে ২০১৬ থেকে ২০১৮ এ দুই বছরে মিয়ানমার ছাড়াও ইরাক, সিরিয়া ও সোমালিয়াসহ প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকো থেকেও শরণার্থী এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে।

২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ছয় লাখেরও বেশি শরণার্থী গ্রহণ করেছে ইউরোপের দেশ ইতালি। লিবিয়া ও সিরিয়াসহ অন্যান্য দেশ থেকে ইতালিতে আশ্রয় নিয়েছে তারা।

কানাডায় তিন লাখ ২০ হাজার শরণার্থী রয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুসলিম অভিবাসন নিয়ে কঠোর নীতি ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেকে কানাডায় পাড়ি দেন। এদের অধিকাংশই আসছে দক্ষিণ এশিয়া, চীন ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে।

ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো হাঙ্গেরিতেও প্রায় ২ লাখ শরণার্থী রয়েছে।

ফ্রান্সেও ভিড় জমাচ্ছে শরণার্থীরা। ১৯৯৯ সাল থেকে দেশটিতে হাজার হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশীরা ভিড় করছে। ফ্রান্সে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার শরণার্থী । অধিকাংশ শরণার্থীই ইরাকের কুর্দি। এছাড়া বাকিরা এসেছেন আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

ইউরোপের দেশ সুইডেনেও রয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার শরণার্থী। উন্নত জীবনের আশায় তারা এখানে আশ্রয় নিয়েছেন।

ইউরোপের ছোট্ট দেশ অস্ট্রিয়ায় ৯০ হাজার শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার শতকরা এক ভাগ।

এছাড়াও ইথিওপিয়ায় ৪০ হাজার, মিসরে ১৪ হাজার, যুক্তরাজ্যে ৮ হাজার সিরীয় নাগরিক আশ্রয় নিয়েছে।

জাতিসংঘ বলছে, ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ ২ কোটি ৫৯ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে গিয়ে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে। এর অর্ধেকই শিশু। ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হওয়া মানুষের মধ্যে প্রতি ১০ জনে একজনের কম শরণার্থী।

প্রতি চারজনের একজন শরণার্থী সিরিয়ার নাগরিক। এর পরই রয়েছে কলম্বিয়া। গত বছর এ দেশের ৮০ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে এ সমস্যা দীর্ঘদিনের। গত বছর সে দেশের ৫৪ লাখ মানুষ স্থানচ্যুত হয়ে অন্য কোথাও বা বিদেশ চলে গেছে।

লেখক: হিমালয় আহমেদ

আরো দেখুন

Leave a Comment