যে কারণে বারবারই মহামারীর খলনায়ক বাদুর

বাদুর

চীনের করোনা ভাইরাসে স্থবির হয়ে পড়ছে অর্থনীতি। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৪৫ জনে। এছাড়া বহু লোককে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে।

এছাড়া দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০ হাজারের বেশি মানুষ। আক্রান্তদের মধ্যে ১১ হাজারের বেশি লোকের অবস্থা সংকটাপন্ন। ২২ ফেব্রয়ারি পর্যন্ত এ ভাইরাস থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২০ হাজার ৬৫৯ জন মানুষ।

চীন জানিয়েছে, আক্রান্ত ও নিহতের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসছে এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। চীনের স্বাস্থ্য কমিশন বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানিয়েছে চায়না গ্লোবাল নেটওয়ার্ক।

চীনের সকল প্রদেশে শনাক্ত হয়েছে করোনাভাইরাস। নিহতদের বেশিরভাগই হুবেই প্রদেশের। প্রদেশটির উহান শহর থেকেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে এই ভাইরাস।

সংক্রমণ ঠেকাতে হাসপাতাল নির্মাণ, করোনাভাইরাস শনাক্তের কিট আবিষ্কারে সরকারি অনুমোদনসহ সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে চীন। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আতঙ্কে জনমানবশূন্য ভৌতিক এলাকায় পরিণত হয়েছে চীনের একেকটি গ্রাম ও শহর।

রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। উহান শহরে স্টেডিয়াম, কনফারেন্স সেন্টারসহ কয়েকটি ভেন্যুকে অস্থায়ী হাসপাতালে পরিণত করা হয়েছে। এই ভাইরাস মোকাবেলায় শুরু থেকে তাদের অবহেলা ও দুর্বলতার কথা স্বীকার করেছে চীন।

হুবেই প্রদেশের রাস্তা-ঘাট, অলি-গলিতে ওষুধ ছিটাচ্ছে প্রশাসন। এছাড়া বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রত্যেকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন মেডিকেল স্টাফরা। যাদেরকে সন্দেহ হচ্ছে তাদেরকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হচ্ছে।

অধিকাংশ মারাত্মক ভাইরাসের বাহক হিসেবে বারবার বাদুরের নাম উঠে এসেছে। চীনে করোনাভাইরাসের বাহক হিসেবেও শুরুতেই বাদুরের নাম উঠে আসে। এরপর দ্বিতীয় বাহক হিসেবে সাপের কথা বলা হলেও অধিকাংশ গবেষক তা নাকচ করে দেন।

বিজ্ঞান সাময়িকী ল্যানসেটে ২৯ জানুয়ারি প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে চীনের সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের অধ্যাপক গিঝেন উ বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, প্রাথমিক পোষক হিসেবে বাঁদুর যেসব ভাইরাস বহন করে সেগুলোর সঙ্গে নতুন করোনাভাইরাসের বৈশিষ্ট্য সঙ্গতিপূর্ণ।

প্রতিবেদনে বাঁদুরকে বলা হয়, ‘ভয়ঙ্কর জৈব খলনায়ক’। পাখাবিশিষ্ট এ স্তন্যপায়ী মারবার্গ, নিপাহ ও হেন্ড্রার মতো প্রাণঘাতি ভাইরাসের বাহক। এ প্রাণী থেকে মানুষে রোগ সংক্রমণের ঘটনা বেশি। এক দশকের মধ্যে উগান্ডা, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ এবং অস্ট্রেলিয়ায় এসব রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

এছাড়া ইবোলা, র্যাবিস, সার্স এবং মার্স ভাইরাসের প্রাকৃতিক পোষকও বাঁদুর। এসব ভাইরাস ছড়ানোর ক্ষেত্রে কখনো কখনো মধ্যবর্তী বাহকও থাকে। ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাস বাঁদুর থেকে সিভেট ক্যাট (খাটাশ) থেকে মানুষে ছড়িয়েছিল। এছাড়া ২০০০ সালের দিকে মার্স ভাইরাস ছড়িয়ে ছিল উটের মাধ্যমে।

মারাত্মক ভাইরাসের বাহক বাঁদুরই কেন? এর ব্যাখ্যায় বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাঁদুরের ১ হাজার ৩০০টিরও বেশি প্রজাতি রয়েছে। তীক্ষ্ণদন্ত স্তন্যপায়ীর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রজাতি বাঁদুর। এন্টার্কটিকা ছাড়া সব মহাদেশেই ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির বাঁদুর রয়েছে।

স্থলচর প্রাণীর মধ্যে বাঁদুরের জীবনকাল তুলনামূলক বেশি। একসঙ্গে অনেক এমনকি লাখ লাখ বাঁদুরও কোনো গুহায় ঘনিষ্ঠভাবে বসবাস করতে পারে। এ কারণেই এদের ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি এবং দ্রুতই পুরো দলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

একমাত্র র্যাবিস ছাড়া এসব ভাইরাস বাঁদুরের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। স্তন্যপায়ী হলেও উড়তে পারা বাঁদুরের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য যা তাকে অনেক রোগ থেকেই রক্ষা করে। উড়ার সময় বাঁদুরের বিপাক ক্রিয়া ও শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। এটি মানুষ ও অন্যান্য স্তন্যপায়ীর জ্বর হলে যেমন হয় তেমনই হয়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এ বৈশিষ্ট্য বাঁদুরের শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দিয়েছে, ফলে ভাইরাসের প্রতি তাদের শরীর বেশ সহনশীল।

২০১৭ সালের এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দাবি করেন, অন্য যেকোনো প্রাণী প্রজাতির চেয়ে বাঁদুর বেশি বিপজ্জনক ভাইরাস বহন করে। ১৮৮টি জ্ঞাত জুনোটিক ভাইরাসের আচরণ নিয়ে করা ওই গবেষণায় দেখা গেছে, অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের চেয়ে বাঁদুরই এসব ভাইরাস প্রজাতির মধ্যে বেশি সংখ্যকের বাহক বা পোষক।

দ্রুত নির্বিচারে বন নিধন ও নগরায়নের ফলে বাঁদুরের আবাস নষ্ট হচ্ছে। তারা চীন, বাংলাদেশ, ভারতের মতো জনবসতি দেশের মানুষের কাছাকাছি বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে করোনা ভাইরাসের মতো মারাত্মক জীবাণুতে আক্রান্ত হওয়া ও মহামারীর আশঙ্কা বাড়ছে।

চীনাদের খাবারের মেনুতে খাবার নয় এমন খাবাও তালিকায় থাকার বিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে চীনারা নিষিদ্ধ অনেক পশু পাখি ও কীতপতঙ্গ খায় যার ফলে বিভিন্ন রোগের জীবাণু ছড়ায়।

সম্প্রতি মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, করোনা ভাইরাস যতই মহামারি হোক, চীনের মুসলিমদের মাঝে তার কোন বিস্তার হয়নি। যার একমাত্র কারণ তাদের হালাল খাদ্যাভ্যাস।

মুসলিমদের খাদ্য তালিকায় হালাল ও হারাম বিভক্ত থাকায় তারা এসব খাবার ভক্ষণ করে না বিধায় বেশ নিরাপদেই রয়েছেন চীনা মুসলিমরা। চীনের জিনঝিয়াং প্রদেশে বিভিন্ন বন্দি শিবিরে উইঘুর মুসলিমদের আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে।

চীনের মুসলিমরা হালাল খাবার পরিবেশন করছেন ধারণা করা হচ্ছিল, তারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বেশ দুর্বিসহ অবস্থায় পড়বে। তবে এমন কিছুই হয়নি। এটি যেহেতু বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় তাই যেকোন সময় মুসলিমদের মাঝেও দেখা যেতে পারে।

গবেষকরা বলছেন চীনাদের উগ্র খাদ্যাভ্যাসের কারণে বন্য পশু থেকে ছড়িয়েছে করোনা ভাইরাস। সাপ, শুকর, উল্লুক, ব্যাং, গাধা, তেলাপোকার ফ্রাই, ইঁদুর, টিকটিকি সজারুসহ নানা রকম কীটপতঙ্গ ও বাদুরের জুস।

এমন কোন পশুই পাওয়া যাবে না যা সেদেশের মানুষ ভক্ষণ করে না। চীনে ঘরে বসে অর্ডার করলেই পাওয়া যায় ১২০ প্রজাতির বন্য পশুর মাংস। বৌদ্ধ সংখ্যা ঘরিষ্ঠ চীনে ২ কোটি ৩০ লাখ মুসলমানের বসবাস করেন। ধর্ম চর্চার ক্ষেত্রে নিং জিয়া প্রদেশের মুসলিমরা বেশ স্বাধীন।

চীনের করোনা ভাইরা ছড়িয়ে পড়েছে আশ পাশের বিভিন্ন দেশে। এখনই খাদ্য তালিকার পরিবর্তন না আনলে চীনাদের মতো মহামারী বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে বলে মনে করে বিশেষজ্ঞরা।

আরো দেখুন

Leave a Comment