যেভাবে সফল হলো ভাষা আন্দোলন

ভাষা আন্দোলনকে বলা হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রাথমিক ফল। আর স্বাধীনতা সংগ্রাম হলো ভাষা আন্দোলনেরই চূড়ান্ত ফলাফল। ভাষা আন্দোলনের অতীত ইতিহাস নিয়ে এ আয়োজন।

দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের দুই অংশের সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও ভাষাগত দিক থেকে কোন মিল ছিলো না।

পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্যেও উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রক্রিয়া শুরু করেন।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ পাকিস্তানের গণপরিষদের তালিকা থেকে বাংলা ভাষাকে বাদ দেয়া হয় এবং পাকিস্তানের মুদ্রা ও ডাকটিকেট থেকে বাংলা বাদ দেয়া হয়।

এছাড়া নৌবাহিনীতে নিয়োগের পরীক্ষা থেকে বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে করা হয়। এর বিরোধীতা করে আন্দোলন শুরু করে তৎকালীন তমদ্দুন মজলিস। এর নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম।

১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে বলেন একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।

১৯৫২ সালে ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন পল্টন ময়দানে এক জনসভায় বলেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে কেবল উর্দু। উভয় স্থানেই উপস্থিত ছাত্ররা এর তীব্র প্রতিবাদ করে।

৩১ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়।

রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি ( একুশে ফেব্রুয়ারি) সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল, জনসভা ও বিক্ষোভ মিছিল আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়।

এসব কর্মসূচির আয়োজন চলার সময় সরকার ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে সমাবেশ-শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভা হয়। সেই সভায় ১৪৪ ধার ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেন ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন এবং গাজীউল হকসহ ছাত্রনেতারা।

২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরের স্কুল-কলেজের হাজার হাজার ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে সমবেত হয়। ছাত্ররা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসলে পুলিশ তাঁদের মিছিলের উপর গুলি চালায়। গুলিতে রফিক উদ্দিন আহমদ, আবদুল জববার, আবুল বরকত সেক্রেটারিয়েটের পিয়ন আবদুস সালাম নিহত হয়।

এর প্রতিবাদে পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি গণবিক্ষোভ ও শোকমিছিলের উপর পুলিশ ও মিলিটারি পুনরায় লাঠি, গুলি ও বেয়োনেট চালায়। এতে শফিউর রহমানসহ কয়েকজন শহীদ হন এবং অনেকে আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার হন।

এরপর আন্দোলন আরো তীব্র হয়ে উঠলে পূর্ব পাকিস্তান অচল হয়ে পড়ে।

এরপর ভাষার দাবি মেনে নিয়ে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিয়ে একটি বিল পাস করা হয়।

এবং ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে বাংলাকেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অনুমোদন দেয়া হয়। আর এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালীর ভাষার অধিকার।

প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি গোটা জাতি ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানান। প্রভাত ফেরি হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্থান করে নিয়ে ভাষা আন্দোলন।

আরো দেখুন

Leave a Comment