মহাজ্ঞানী সক্রেটিসের জ্ঞান ভাবনা

Statue of Socrates

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ফিলোসফি বা দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। ফিলোসফিতে সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিস্টটল এ তিনজনের নাম যুগ যুগ ধরে থাকবে। জ্ঞানের ইতিহাসে সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিস্টটল আলোকিত নক্ষত্র। তবে পরিতাপের বিষয় প্লেটো ও এরিস্টটলের লিখিত বই থাকলেও সক্রেটিসের নিজের লেখা বই নেই। তার পরেও তিনি বিশ্বের ফিলোসফিতে মেন্টর। সক্রেটিস কোনও বই না লিখলেও ভাবশিষ্য প্লেটোর লেখা বইগুলোতেই মহাজ্ঞানী সক্রিটিসের বিষয়ে জানবার সম্ভব হয়। তার জীবন সম্পর্কে জানতে হলে প্লেটোর ডায়ালগসমূহ, এরিস্টোফেনিসের নাটক সমূহ ও জেনোফেনোর ডায়ালগসমূহ পাঠ করতে হবে।

সক্রেটিস খ্রি: পূ: ৪৭০ অব্দে গ্রীসের এথেন্স এ জন্ম গ্রহণ করেন। খ্রি: পূ: ৩৯৯ অব্দে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে হেমলক বিষ পানে মৃত্যুদণ্ড গ্রহণ করেন। সক্রেটিসের বাবা ছিলেন ভাস্কর মাতা ছিলেন ধাত্রী।

সক্রেটিসের জীবন ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রথমে বাবার পেশাকে বেছে নিলেও অজানাকে জানার নেশায় বাবা পেশা ত্যাগ করে ফিলোসফিতে মনোনিবেশ করেন। এনাক্সাগোরাস ছিলেন সক্রিটিসের ভাবগুরু।

‘নৌ দাইসেল্ফ’ বা ‘নিজেকে জানো’ এটি সক্রেটিসের যুগাতীত, কালাতীত উক্তি। নিজেকে জানার মাধ্যমেই জগত সম্পর্কে বোঝা ও জানা সম্ভব। এই সত্যটিই সক্রেটিস মনে প্রাণে বিশ্বাশ করতেন। এবং জীবনের শেষ অব্দি আকরে ধরে রেখেছিলেন। এথেন্সের পথে প্রান্তরে রে বেড়াতেন সুযোগ পেলেই নানা রকম ও অদ্ভুদ প্রশ্ন করতেন এ মহাজ্ঞানী সক্রেটিস। উত্তর নিজে থেকেই বের করতেন সক্রেটিস। একই সঙ্গে একই প্রশ্নের উত্তর অন্যেরা কিভাবে দিতেন তাও দেখতেন তিনি। অন্যের উত্তর ও নিজের উত্তর নিজেই মেলাতেন। জ্ঞান অন্বেষণী সক্রেটিসকে এথেন্সবাসী জ্ঞানী বললেও নিজেকে জ্ঞানী বলতে বারণ দিতেন। তিনি নিজেকে জ্ঞান অনুরাগী মনে করতেন।

ওয়েস্টার্ন ফিলোসফির এ জনকের দৃষ্টিতে মানবের পৃকৃত সৌন্দর্য হলো তার জ্ঞান। আর অজ্ঞানকে তিনি সবচেয়ে খারাপ বলে মানতেন। জ্ঞানীরা সব সময় নিজেকে কিছুই জানে না বলে মনে কররেন। সক্রেটিসের ভাষায়, আই নৌ দ্যাট আই নৌ নাথিং মানে আমি জানি যে আমি কিছুই জানি না। কেউ যদি মনে করে যে সে কিছুই জানে না, তাহলে তার জানার প্রতি আগ্রহ থাকবে। ফলে নিজের জানার ও জ্ঞানের পরিধি বাড়ার সম্ভাবনা থাকবে এটাই সক্রেটিসের উক্তির মূল বিষয়। সক্রেটিসের মতে বিস্ময় হলো জ্ঞানের শুরু। মানে, কোনকিছুর প্রতি বিস্ময় জাগলেই সে বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন শুরু হয়। জ্ঞান আহরণে প্রশ্ন-উত্তর অতি প্রয়োজনীয় বলে সবাইকে প্রশ্ন করতেন।

প্রশ্নের মাধ্যমেই ফিলোসফিক্যাল আলোচনা চালাতেন। প্রথমে যুক্তি তারপর যতক্ষন প্রতিপক্ষ পরাজিত হয়ে ভুল স্বীকার না করত, ততক্ষন প্রশ্ন করতেই থাকতেন। এই পদ্ধতিটিকে সক্রেটিসের শ্লেষ বা সক্রেটিক আইরোনি বলা হয়। এর মাধ্যমে উত্তরদাতা তার চেষ্টার সর্বোচ্চ স্তরে পৌছে যান। ব্যক্তির থেকে উত্তর বের করে তাকে দেখিয়ে দিতেন যে, জ্ঞানটা তার মধ্যেই ছিলো। এভাবেই তিনি মানুষের মাঝে জ্ঞান চর্চার বিজ বপন করতেন।

সক্রেটিসের দৈহিক কাঠামো দেখতে সুন্দর ছিল না। প্রসস্ত টাক বিশিষ্ট মাথা, বৃহদাকার শরীর, চ্যাপ্টা নাক, ছোট চোখ।তবে দৈহিক সৌন্দর্যই সব নয় মনটা ছিল তার রসে ভরপুর। রসিকতা করেই শিক্ষা দিতেন। পথ-ঘাটকেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিনত করেছিলেন। উদাসীন হয়েছিলেন সংসারের প্রতি। আর তাই স্ত্রী জানথপির রোষানলে বারবার পড়তে হতো। তবে যার মন রসে পরিপূর্ণ, সে কি দগ্ধ হতে পারে?

একদিন তার স্ত্রী জানথপি অনেক বেশি রেগে যান তবে সক্রেটিস সেদিকে কর্ণপাত না করে নিজের মতো বই পড়তে থাকেন। তা দেখে জানথপি আরও রেগে গিয়ে এক বালতি পানি নিয়ে যায় ও সক্রেটিসের মাথায় ঢেলে দেন। এতেও মহাজ্ঞানী সক্রেটিস রাগ করেননি।ওই সময় বরং কৌতুক করে মেঘ গর্জন করার পর এক পশলা বৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক বলে ঘরের বাইরে চলে যান।

এই সহজ সরল মানুষটির পেছনে এক সময় শত্রু লেগে যায়। তারা হলো তৎকালীন শাসক গোষ্ঠী ও জ্ঞানী বলে যারা পরিচিত ছিলো। তারা সক্রেটিসকে দেখলে তাদের মুখ শুকিয়ে যেতো। কারণ তারাও তার প্রশ্নে বিদ্ধ হয়ে হার মানত। তাই তার পেছনে শত্রুতা শুরু হয়।

প্রচলিত দেব-দেবীর মূর্তির বিরোধিতা করার অভিযোগ যা রাষ্ট্রদ্রোহীতার সঙ্গে তুলনা হতো। আর তিনি যুব সমাজকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন। যুব সমাজের মধ্যে দুর্নীতি ও চরিত্রহীনতা প্রবেশ করানোর অভিযোগেও অভিযুক্ত করা হয়। তার শাস্তি স্বরূপ মৃত্যুদণ্ড স্থির করা হয়।

প্লেটোর ফিডো গ্রন্থে সক্রেটিসের মৃত্যুর কথা বলা আছে। তার মৃত্যুর জন্য হেমলক বিষ আনা হয়। কারাগার থেকে পালানোর জন্য তিনি ক্রিটোর অজুহাত প্রত্যাখান করেন। বিষ পান করানোর পর কর্তৃপক্ষের আদেশে তাকে হাটতে বলা হয়।শরীর অবশ হয়ে আসা পর্যন্ত হাটতে থাকেন। তারপর শুয়ে পরেন।

মৃত্যুর সময় ক্রিটোকে বলেছিলেন, ” অ্যাসক্লেপিয়াস ( প্রচীন গ্রীসের আরোগ্যলাভের দেবতা) একটি মোরগ পায়, ওইটা পরিশোধ করে দিও।” এর থেকে কি বুঝা যায়? তিনি মৃত্যুকেই আরোগ্যলাভ বলে ইঙ্গিত করেছেন। তারপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ হয়ে যায় তার। দর্শন আকাশের জ্বলন্ত একটি তারকা খসে যায়। কিন্তু তার জ্যোতি আজও আমাদেরকে আলোকিত করে।

আরো দেখুন

Leave a Comment