ব্যাপক রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় মালয়েশিয়া

মালয়েশিয়া মাহাথির

দিনভর নানা নাটকীয়তার পর পদত্যাগ করেছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী তথা বিশ্বের সবচেয়ে বর্ষিয়ান প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। কেবল তাই নয় ছেড়েছেন তার দল পার্টি প্রিবুমি বেরসাতু মালয়েশিয়া (পিপিবিএম) প্রধানের পদও। মাহাথিরের হঠাৎ পদত্যাগ ঘিরে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। সরকার আর দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে অস্পষ্টতা।

মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে কখনও বন্ধু আবার কখনও শত্রু হয়ে প্রায় চার দশক ধরে জড়িয়ে আছেন মাহাথির মোহাম্মদ (৯৪) আর আনোয়ার ইব্রাহিম (৭২)। দুই বছর আগে যখন রাজনীতিতে আনোয়ার ইব্রাহিমকে নিয়ে জোট বাঁধেন মাহাথির তখন শর্ত ছিল দুই বছর পর ক্ষমতায় আসবেন আনোয়ার।

তবে রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। বলা হচ্ছে, ইব্রাহিমকে দেয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে এখন আর রাজি নন মাহাথির। নতুন জোট সরকার গঠনের লক্ষ্যে ২৩ ফেব্রয়ারি-২০২০ রোববার বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে মাহাথিরের পিপিবিএমের আলোচনার খবরে তাই সন্দেহ ওঠে আনোয়ারের বাদ পড়া নিয়ে।

যাকে আনোয়ার ইব্রাহিম মনে করছেন ষড়যন্ত্র আর বিশ্বাসঘাতকতার রাজনীতি হিসেবে। আনোয়ারের নিজ দল পিপল’স জাস্টিস পার্টি (পিকেআর) এর কিছু বিশ্বাসঘাতক আর মাহাথির, ইউনাইটেড মালায়স ন্যাশনাল অরগানাইজেশন (ইউএমএনও) এর সঙ্গে মিলে নতুন জোট করার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন তিনি। একে রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তবে গত কয়েক মাস ধরেই মাহাথির বলছিলেন পরিকল্পিতভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে আরও সময় লাগবে, তবে কতটা সময় লাগবে তার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ জানাননি মাহাথির।

নিজের পদত্যাগ নিয়ে এখনও মুখ খোলেননি মাহাথির। তিনি কি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াতে চাইছেন নাকি নতুন জোট গঠন করবেন তা নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা।

তবে সমালোচকেরা বলছেন, দীর্ঘদিন মালয়েশিয়া শাসন করা সবচেয়ে বেশি বয়সী এই নেতা স্বেচ্ছায় কারো হাতে ক্ষমতা দেবেন না। নতুন জোট সরকার গঠন করা হলে মাহাথিরের এই দায় আর থাকবে না আর কারো হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের।

১৯৮১ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২২ বছর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন মাহাথির। ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক সংকট কীভাবে মোকাবিলা করা হবে তা নিয়ে বিরোধে আনোয়ার ইব্রাহিমকে বরখাস্ত করেন মাহাথির।

দুর্নীতির দায়ে কারাভোগও করেন আনোয়ার। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে নাজিব রাজাক সরকারকে সরাতে অতীত শত্রু সেই আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গেই জোট বাঁধার ঘোষণা দেন মাহাথির, তখন সবাই অবাকই হয়েছিলেন।

নির্বাচনে জয়ের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমায় কারাগার থেকে মুক্ত হন আনোয়ার। তবে দুই বছরের মধুচন্দ্রিমার পর মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে আবারো মাহাথির-আনোয়ার দ্বন্দ্ব রঙ ছড়ালো।

২০১৮ সালে ক্ষমতায় এসে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন মাহাথির তবে ২৪ ফেব্রয়ারি-২০২০ সোমবার তাকে পদত্যাগের বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। কিন্তু দেশটির রাজা তাকে অন্তবর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।

তার পাকতান হারাপান নামের জোটের ভেতরে উত্তেজনা দেখা দেয়ার পর তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ২০১৮ সালে দুর্নীতিতে ডুবে যাওয়া একটি সরকারের পতন ঘটিয়ে তারা ক্ষমতায় এসেছিলেন। মূলত আনোয়ার ইব্রাহীম যাতে প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হতে না পরেন, তা নিশ্চিত করতেই এসব কৌশল নেয়া হয়েছিল।

তবে বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক প্রধানমন্ত্রী মাহাথিরকে ক্ষমতায় থাকতেই তার জোট অনুরোধ জানায়। আনোয়ার ইব্রাহীমকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে ও নতুন সরকার গঠনের ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

এ রাজনৈতিক নাটক প্রথম প্রকাশ্যে আসে ২৩ ফেব্রয়ারি যখন ক্ষমতাসীন জোটে আনোয়ারের প্রতিদ্বন্দ্বীরা ও বিরোধী রাজনীতিবিদরা কুয়ালালামপুরে কয়েকদফা বৈঠক করেন, তখন নতুন একটি জোট গঠনের বিষয়টিই প্রকাশ্যে চলে আসে।

মূলত প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে আনোয়ারকে বাদ দিতেই এতসব উদ্যোগ। এর আগে বিভিন্ন মিথ্যা অভিযোগে তাকে কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়েছে।

সরকারের ভাগ্য পরের দিন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়লে পদত্যাগের ঘোষণা দেন মাহাথির। রাজা সেটি গ্রহণও করেন তবে তাকে অন্তবর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব পালনের অনুরোধ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টা পর দেশটির অন্তবর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মাহাথির মোহাম্মদ। দেশটির রাজা পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে এ নিয়োগ দেন বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন মন্ত্রীপরিষদ সচিব মো. জুকি আলি।

নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেয়ার আগপর্যন্ত মাহাথির দেশের প্রশাসনিক সব দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানান তিনি। আরেকটি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনায় মন্ত্রি পরিষদ বাতিল করা হয়েছে।

এদিন দুপুর ১টায় রাজার কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান মাহাথির মোহাম্মদ। বিকেল ৫টায় জানানো হয় এটি গৃহীত হয়েছে।

সরকারের মুখ্যসচিব বলেন, সব মন্ত্রীদের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। তবে নতুন জোট গঠনে মাহাথিরও জড়িত বলে জল্পনা-কল্পনার মধ্যে আনোয়ার ও তার অংশীদাররা বলেন, তিনি এতে জড়িত ছিলেন না।

মাহাথিরের সঙ্গে আনোয়ারের এক ধরনের ঝোড়ো সম্পর্ক রয়েছে। আনোয়ার বলেন, ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণের কথা মাহাথির তার কাছে অস্বীকার করেছেন। কাজেই বিষয়টি পরিষ্কার যে আগের সরকারের সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে তিনি কাজ করবেন না।

সংযুক্ত মালয়স জাতীয় সংস্থা(ইউএমএনও) নামে নতুন জোট গঠনের প্রস্তাবে আগের ক্ষমতাসীন দলকেও অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে। অথচ গত দুই বছর আগে ওই দলের প্রধান নাজিব রাজাককে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে।

কাজেই তখন দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত জোটকে মোকাবেলায় নিজেদের মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে রাখতে রাজি হয়েছিলেন আনোয়ার ও মাহাথির।

এএফপির খবরে বলা হয়, পাকাতান হারাপান জোটের অংশীদার ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন পার্টির জ্যেষ্ঠ সদস্য লিম গুয়ান ইনজ বলেন, সরকার পতনের দুরভিসন্ধিমূলক চেষ্টার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছেন মাহাথির।

মাহাথির স্পষ্টভাবেই বলেন, তিনি ইউএমএনও’র সঙ্গে কাজ করতে পারবেন না। কারণ আগের নির্বাচনে এই জোটকে হারাতে তিনি কঠিন পরিশ্রম করেছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে তার দল তাকে নিয়োগ দিয়েছে।

রাজনৈতিক উত্তেজনা যখন বাড়ছে, তখন বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট থেকে সরে দাঁড়িয়েছে মাহাথিরের বেরসাতু পার্টি। আর আনোয়ার ইব্রাহীমের দলের বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতাও পদত্যাগ করেছেন। এতে পাকাতান হারাপান জোটের ত্রাহী দশা।

কাজেই নতুন একটি প্রতিদ্বন্দ্বী জোট গঠনের বিষয়টিও এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। নিজের দল থেকে অবশ্য মাহাথিরও পদত্যাগ করেছেন।

স্বাধীন নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান মেরদেকা সেন্টারের প্রধান ইব্রাহীম সুফিয়ান বলেন, মাহাথির ফের প্রধানমন্ত্রীত্বের দায়িত্ব নিতে পারেন। কারণ সংকট শেষ পর্যন্ত তার পক্ষেই কাজ করছে। এই পরিস্থিতি ক্ষমতাসীন জোটকে নতুন গড়ন দিতে তাকে একটি সুযোগ এনে দিচ্ছে।

কাজেই এই নাটকের ফল এখনো পরিষ্কার হয়নি। বিশ্লেষকদের ধারনা, আগাম নির্বাচনের ঘোষণাও আসতে পারে।

নাজিবকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সাবেক শত্রু মাহাথিরের সঙ্গে জোট বেঁধেছিলেন আনোয়ার। ১এমডিবি দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন নাজিব রাজাক।

গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক দৃশ্যপটে মাহাথির-আনোয়ারের কঠিন রাজনৈতিক সম্পর্ক প্রধান্য বিস্তার করে আসছিল। ১৯৯০ এর দশকে আনোয়ার ইব্রাহীমকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।

পরে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সমকামিতার অভিযোগ আনা হয়েছিল। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

পাকাতান হারাপানকে সবসময়ই একটি অস্বস্তিকর জোট হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে তাদের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে।

দেশটির নৃতাত্ত্বিক মালয় মুসলিম সংখ্যালঘুদের দিকে নজর দিতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া সংস্কারের ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে রয়েছেন।

মালয়েশিয়ায় জাতিগোষ্ঠী ও মালয়দের অধিকার সুরক্ষা খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। তাদের ৬০ শতাংশই মুসলমান। এছাড়া নৃতাত্ত্বিক চায়না ও ভারতীয় সংখ্যালঘুরাও রয়েছেন।

মাহাথিরের পদত্যাগের পর তার দল পার্টি প্রিবুমি বেরসাতু (পিপিবিএম) এর ২৬ এমপি ও আনোয়ার ইব্রাহিমের পার্টি কেদিলান রাকইয়াত (পিকেআর) এর ১১ এমপি পদত্যাগের ঘোষণা দিলে ক্ষমতাসীন জোট পাকাতান হারাপান (পিএইচ) পার্লামেন্টে সংখ্যা গরিষ্ঠতা হারায়।

এদিকে চার দলীয় জোট পিএইচের ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন পার্টি (ডিএপি)র মহাসচিব লিম গুয়ানিং মাহিথির মোহাম্মদকে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, বিরোধী দলের সঙ্গে নতুন কোনো জোট গঠন করতে চাননি মাহাথির। এটি পিএইচ-এর কয়েকজন নেতার ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেন তিনি।

আরো দেখুন

Leave a Comment