বিয়ের প্রস্তুতিই ছিল ক্ষুদিরামের মৃত্যুর প্রস্তুতি !

বিপ্লবের রক্ত তখন ক্ষুদিরাম বসুর রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আঠারোর এই যুবকের বর্তমান, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা ভাবনা ছিল না। লক্ষ্য শুধু একটাই, দেশের স্বাধীনতা। হয় দেশ স্বাধীন হবে, না হয় প্রাণ যাবে স্বাধীনতার আন্দোলনে।

তবে বিপ্লবের তাজা রক্তও মজেছিল প্রেমে। বিয়েও করতে চেয়েছিলেন। বন্ধুদের সে কথা জানিয়ে ছিলেন। বীর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুকে নিয়ে একটু অন্য গল্পের সন্ধানে এই আয়োজন।

ক্ষুদিরাম বসুর বন্ধুরা হঠাৎ একদিন দেখেন, ক্ষুদিরাম দোকান থেকে জুতা কিনছেন। তারা রীতিমতো অবাক। কারণ তারা জানত ক্ষুদিরাম বেশ কিছুদিন আগে থেকে জুতা পরা ছেড়ে দিয়েছে। বিদেশিদের হাতে তৈরি জিনিস তিনি পড়বেন না। রন্ধ্রে রন্ধ্রে দেশ প্রেম। অবাক বন্ধুরা ক্ষুদিরামকে প্রশ্ন করেছিল – ‘জুতা কি হবে?’

ক্ষুদিরাম হেসে উত্তর দিয়েছিলেন – ‘বিয়ে করতে যাচ্ছি, বিয়েতে নতুন জুতা পরতে হবে’ তাঁর উত্তর শুনে বন্ধুরা আবার কিছুটা অবাকও হলো। কারণ ক্ষুদিরাম বলতেন, তিনি কখনও বিয়ে করবেন না। বন্ধুদেরও সংসার না করে দেশের কাজ করার কথা বলতেন।

তবে ক্ষুদিরামের সহজ সরল কথাবার্তা বন্ধুরা অবিশ্বাস করতে পারল না। তাই ক্ষুদিরামকে তারা জিজ্ঞাসা করল – ‘কোথায় যাওয়া হচ্ছে বিয়ে করতে? আর বিয়ে করে কবেই বা ফেরা হবে?’ ক্ষুদিরাম হেসে বলেছিলেন, ‘কি জানি ফিরব কিনা, শুনেছি আমাকে ঘরজামাই করে রাখা হবে।

আসলে ক্ষুদিরাম দেশপ্রেমে মগ্ন ছিলেন, তাঁকেই বিবাহ করার কথা মজার ছলে বলেছিলেন। সেই বিয়ের বন্ধন ছেড়ে তাঁর আর ফিরে আসা সম্ভব নয় সেটাও তিনি বলে দিয়েছিলেন। এই ঘটনার পরেই ঘটে কিংসফোর্ড হত্যার চেষ্টা।

১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল, রাত ৮টায় ওত পেতে ছিলেন ক্ষুদিরাম ও তাঁর সঙ্গীরা। সাদা ফিটন গাড়িটি কাছে পৌঁছানো মাত্র গাড়িটি লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করলেন। প্রচণ্ড শব্দে বোমা ফাটে গাড়ির উপর। হামলার নায়ক ক্ষুদিরাম আর প্রফুল্ল চাকী। তবে তাঁরা জানতেন না ভুলবশত বোমা গিয়ে যে গাড়িতে পড়েছে সেই ফিটন গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না। ছিলেন দুইজন বিদেশিনী। নিহত হন মিসেস কেনেডি আর তার কন্যাসহ চাকর।

ধরা পড়ার পর বোমা হামলার সব দায় স্বীকার করেন ক্ষুদিরাম। অন্য কোন সহযোগীর নাম বা কোন গোপন তথ্য শত অত্যাচারেও প্রকাশ করেননি। আদালতে ক্ষুদিরামের বিচার কাজ শুরু হয় ০৮ জুন ১৯০৮। তবে পুরো পশ্চিমবঙ্গ থেকে কোন আইনজীবী তার পক্ষে আদালতে দাঁড়াতে সাহস পাননি। তখন পূর্ববঙ্গ থেকে রংপুর বারের উকিল সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তী, কুলকমল সেন ও নগেন্দ্রনাথ লাহিড়ী ক্ষুদিরামের পক্ষে মামলায় পরিচালনায় এগিয়ে আসেন।

৬ দিন চলে বিচার। বিচারের শুরুতেই ক্ষুদিরাম স্বীকারোক্তি প্রদান করেন। তবে বিচারক কর্নডফ এই স্বীকারোক্তিকে এড়িয়ে আদালতের প্রচলিত নিয়মেই বিচার করা হবে বলে দেন। রংপুর থেকে যাওয়া তিন আইনজীবী দুই দিন সরকারী সাক্ষীদের জেরা করলেন।

তবে ক্ষুদিরাম তখন প্রাণের মায়া ত্যাগ করে নিজেকে দেশমাতৃকার হাতে সমর্পণ করেছিলেন। ১৯০৮ সালের ১১ আগষ্ট হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চে জীবন উৎসর্গ করেন ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের শহীদ ক্ষুদিরাম বসু।

আরো দেখুন

Leave a Comment