বাইজির মসজিদ; যে মসজিদে নামাজ হয়নি কোনো দিন !

বাইজির মসজিদ মাঝিগাছা

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা কুমিল্লা শহরের উত্তর দিক দিয়ে বয়ে যাওয়া গোমতী নদীর সামান্য উত্তরে মাঝিগাছা গ্রাম। ত্রিপুরার মহারাজার রাজদরবারের শ্রেষ্ঠ বাইজি নূরজাহান ছিলেন এ গ্রামের কন্যা।

৪০ বছর বয়সে তাকে মহারাজা অবসরে পাঠিয়ে মাঝিগাছায় কয়েক একর জমি, নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার দান করেন। নূরজাহান মাঝিগাছা গ্রামে বসবাস শুরু করেন ও নিজেকে জমিদারের বিধবা স্ত্রী হিসেবে প্রচার করেন।

নূরজাহান গ্রামের গরিব মানুষকে নানা রকম সাহায্য-সহযোগিতা করতেন তবে সব সময় অতীত জীবনের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনায় ভুগতেন। ভাবতেন পাপে ভরা তার জীবন থেকে কিভাবে মুক্তি পাওয়া যাবে।

এই ভাবনা থেকে একদিন শরণাপন্ন হন স্থানীয় এক মাওলানা সাহেবের, মাওলানা সাহেব নূরজাহানকে একটি মসজিদ নির্মাণের পরামর্শ দেন। এতে আল্লাহ হয়তো ক্ষমা করে দিতে পারেন বলে তিনি নূরজাহানকে জানান।

মাওলানা সাহেবের পরামর্শক্রমে মসজিদ নির্মাণের জন্য নূরজাহান জমি ও অর্থ দান করেন। যথাসময়ে কাজ শুরু হয়ে মসজিদ নির্মাণের কাজ ও সময়মতো শেষ হয়। ধার্য করা হলো মসজিদে প্রথম নামাজ পড়ার দিন।

ওই নামাজে ইমামতি করবেন মসজিদ নির্মাণের পরামর্শদাতা ওই মাওলানা সাহেব। একই সাথে সম্পন্ন হলো দাওয়াত কার্যক্রমও। যথাসময়ে এলাকাবাসী ও ইমাম উপস্থিত হলেন মসজিদ প্রাঙ্গণে।

উপস্থিত এলাকাবাসীর উদ্দেশে মাওলানা সাহেব কিছু বক্তব্য দিলেন। সেই বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করলেন, নূরজাহানের অতীত জীবনের কথা, অতঃপর মসজিদ নির্মাণের ঘটনা।

সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত মুসল্লিরা বলে উঠলেন, আমরা এ মসজিদে নামাজ পড়ব না, এটি নটীর মসজিদ। সেই থেকে আর কোনো দিন এ মসজিদে হয়নি আজান, হয়নি কোনো নামাজ, উচ্চারিত হয়নি আল্লাহু আকবার ধ্বনীও।

এ ঘটনার পরে নূরজাহানের জীবনে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটে ছিল ইতিহাস থেকে জানা যায়নি। কেউ বলছেন অপমানে নূরজাহান আত্মহত্যা করেছিলেন ও তাঁর নির্মিত মসজিদের পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে।

সেই থেকেই মসজিদের পশ্চিম দিকের কিছু অংশ আজও ব্যবহৃত হচ্ছে কবরস্থান হিসেবে। প্রায় ২৫০ বছর ধরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই নটীর মসজিদ বা বাইজি মসজিদটি।

এক পরিত্যক্ত বাইজির মসজিদের কথা বলছি আমি-

মসজিদ নির্মাণের নেপথ্যের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন গিয়াসউদ্দীন একরাম নামের এক ব্যক্তি। নিচে গিয়াস উদ্দীন একরামের লিখাটি হুবহু উপস্থাপন করা হলো –

আমি এক পরিত্যক্ত বাইজির মসজিদের কথা বলছি? প্রথম যেদিন বাইজির মসজিদ নামটি শুনেছিলাম তখন একটু অবাকই হয়েছিলাম, বাইজি বা নর্তকি মসজিদ হয় কি করে! আবার স্থানীয়ভাবে অনেকে এটিকে নটীর মসজিদ বলেও জানে।

বিষয়টি নিয়ে জানার খুবই আগ্রহ হয়েছিল আমার, তখন আমার এক বন্ধু প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতা করে ওই এলাকা সম্পর্কে ভালো চেনা জানা আছে তার। তাকে অনুরোধ করলাম সেই বাইজির মসজিদটি আমাকে একটু দেখাতে।

বন্ধু আমাকে নিয়ে কুমিল্লার কাপ্তান বাজার হয়ে গোমতী নদী পেড়িয়ে বাধের ঠিক ঢালু জায়গাটায় তার মোটর সাইকেলটা দাড় করালেন তবে এখানে কোন মসজিদ তো দেখছি না , তখন বন্ধু আমাকে বলল, তুই কোন কথা বলবি না , চুপচাপ আমার সাথে আয়।

পাশে একটা করাত মিল, বন্ধু আমাকে নিয়ে সেই মিলে গিয়ে বসল, সেই মিলের মালিক তার পরিচিত তাই খানিকটা গল্প শুরু করে দিল তবে আমার মধ্যে নটীর মসজিদ দেখার জন্যে একটা অস্থিরতা কাজ করছে।

কিছুক্ষণ পর বন্ধু বলল, একটু ইয়ে করে আসি আর আমিও ইয়ে করার জন্যে তার পিছুপিছু গেলাম। মিলের ঠিক পেছনে ছোট্ট একটা ঝোপঝাড়, এরমধ্যেই একটা অতিশয় পুরনো জড়াজীর্ণ দালানকোঠার ভংগাবশেষ চোখে পড়ে, এই জীর্ণ দালানের চারদিকে অবৈধ দখলদাররা ধাক্কাতে ধাক্কাতে একবারে এটার গায়ে এনে লাগিয়েছে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী দাড়িয়ে আছে এই কথিত বাইজির মসজিদ

বন্ধু আমাকে বলল, এটাই নটীর মসজিদ , চারদিকে সবাই তার জায়গা দখল করে ফেলেছে তাই কেউ এটি দেখতে এলে এরা ক্ষিপ্ত হয়। আমার কাছে অবাক লাগল দখলদার যেভাবে দখল করেছে তাতে তো এতদিনে জীর্ণ দালানটাকে মাটির সাথে মিশিয়ে অন্য কোন স্থাপনা তৈরি করে ফেলার কথা তবে এখানেই নিষ্ঠুর বাস্তবতা এসে থমকে দাঁড়ায় আর সামান্য হলেও সত্যের কাছে মাথা নত করে।

নটীর মসজিদ বা বাইজির মসজিদ একটি সামাজিক বিতর্কিত বিষয়, তখনকার সমাজে বাইজির টাকায় নির্মাণ হয়েছে বলে এটিকে প্রত্যাখ্যান করেছিল আর এখন পর্যন্ত মানুষ ভৎসমা করে এটিকে নটীর মসজিদ বলে ডাকে।

তবে তারপরও কেন তারা এই দুই শ বছরে মসজিদটি মাটির সাথে গুড়িয়ে দিতে পারছে না কারণ একটাই মানুষ মুখে এটাকে যত তীরস্কার করুক আল্লাহর বিচারের উপর কারো হাত নেই, প্রত্যেকের মধ্যেই একটা বিষয় হয়তো কাজ করেছে মহিলাটি যেমনই হোক তার এই অনুশোচনা ক্ষমা প্রার্থনা হয়তো আল্লাহ ক্ষমাও করতে পারে।

সে কারণেই কোন এক অসহায় নারীর করুন আর্তনাদের মিনার হয়ে আজও শতাব্দীর পর শতাব্দী দাড়িয়ে আছে এই কথিত বাইজির মসজিদ। তবে কে এই বাইজির? কেনইবা সে জীবনের শেষে এসে এই মসজিদটি নির্মাণ করে এতটা বিতর্কিত হয়ে গেছেন?

এইসব প্রশ্ন জানতে করাত মিল থেকে বের হয়ে হাটতে হাটতে একটু সামনে আমাকে নিয়ে গেছে মাষ্টার বন্ধু, সেখানে পরিচয় হয় আবুল হোসেন নামে এক বৃদ্ধের সাথে, খুব চমৎকার একটা সালাম দিয়ে আবুল হোসেনের সাথে অল্পতেই ভালো একটা সম্পর্ক তৈরি করে ফেললাম।

তারপর শুরু করলাম বাইজির মসজিদ প্রসঙ্গ। কথা প্রসঙ্গে আবুল হোসেন আমাকে হাত দিয়ে দেখালেন এই যে নতুন মসজিদটা দেখছেন এটাও সেই মহিলার নিজের জায়গায় মানুষ করেছে।

সে একটু ক্ষোভ প্রকাশ করেই বললেন, বাইজির টাকায় মসজিদ করলে নামাজ পড়া যায় না তবে বাইজির জায়গায় মসজিদ করলে সেখানে নামাজ পড়া যায়। এরপর মুল ঘটনা জানার জন্যে তাকে নানা ভাবে চেষ্টা করলাম যাতে সে বলতে উৎসাহী হয়ে উঠে।

আবুল হোসেন বলতে শুরু করলেন, প্রায় দুই শ বছর আগের কথা, তখন আগরতলার মহারাজার অধীনে বর্তমান কুমিল্লা জেলা ছিল। এই নন্দীরবাজারের একদল ছোট্ট শিশু পাশের জংগলে লাকড়ী কুড়াতে গেছে , হটাৎ একটি মেয়ে শিশুকে বিষাক্ত সর্পে দংশন করেছে।

গ্রামের ওঝারা এসে বলল, শিশুটির দম ছেপে আছে তাকে কলার ভেলায় করে গোমতী নদীতে ভাসিয়ে দিতে হবে, সেই কথা মতো শিশুটিকে ভাসিয়ে দেওয়া হয় গোমতী নদীতে। সেই ভেলা ভাসতে ভাসতে চলে যায় অনেক দূরে।

একসময় এক বেদের চোখে পড়ে শিশুটি, সেই বেধে তাকে তুলে নিয়ে সুস্থ করে তুলে। শুরু হয় শিশুটির নতুন পরিচয়, বেদের সন্তান হিসেবে শিশুটি বড় হতে থাকে, নাচ গান আর সাপের খেলা শিখতে থাকে।

একদিন সেই বেদে পরিবার সাপের খেলা আর নাচ গান দেখাতে আগরতলার রাজ পরিবারে যায়, সেখানে মহারাজ মেয়েটির নাচগান দেখে শুনে মুগ্ধ হয়ে তাকে রাজ নর্তকী করে কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন।

টাকার লোভে বেদে পরিবার মেয়েটিকে বিক্রি করে দেয় রাজ দরবারে আবার শুরু হয় অসহায় কিশোরীর জীবনে অন্য আরেক অধ্যায়, প্রকৃতিই তাকে একদিন মায়ের আচল হারা করেছিল আবার প্রকৃতিই আজ বেদে পরিবারের সাথে জন্মানো একটা হৃদয়ের সম্পর্ককে ছিন্ন করে আগরতলা রাজদরবারে পণ্য হিসেবে এনে হাজির করল।

বাস্তবে এই অসহায় কিশোরীর জীবন নিয়ন্ত্রণের কোন ক্ষমতাই তার নিজের হাতে ছিল না, এভাবেই বছরের পর বছর মেয়েটি কিশোরী থেকে যৌবনা হয়, তারপর ধীরে ধীরে বৃদ্ধা হয় এক সময়।

রাজদরবারে তার প্রয়োজন এখন ফুরিয়ে গেছে তাই আবার তাকে নিয়ে নতুন খেলা খেলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে প্রকৃতি, এবার তার জীবনে আরেকটা পরিবর্তন প্রয়োজন, রাজ দরবার থেকে কোথাও তাকে সরে পড়তে হবে।

সেই শিশুটি যখন বৃদ্ধা হয় তখন ভাগ্যক্রমে নিজের পরিবারের নাম ঠিকানা ও অতীত ইতিহাস জানতে পারে, আর সেই সব ব্যবস্থাই করে দেয় নিয়তি। তখন সেই বৃদ্ধা নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার আগ্রহ দেখালে মহারাজা তাকে প্রচুর ধনরত্ন অর্থ কড়ি রাজকীয় বাহন দিয়ে নিজ গ্রামে পাঠিয়ে দেয়।

এরপরই সেই নারী নিজ গ্রামে এসে বাস করা শুরু করে তবে ততক্ষণে গ্রামময় রটে গেছে এক বাইজি এসেছে গ্রামে আর তাতে আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠে চারদিকে।

তখন সেই নারী আত্মশুদ্ধির পথ খুঁজতে থাক । তিনি তার অতীত জীবনের জন্যে অনুতপ্ত হতে থাকেন । এক পর্যায়ে তার মনে হয় তিনি যদি এলাকায় একটি মসজিদ তৈরি করে দেন তাহলে হয়তো আল্লাহ তাকে ক্ষমা করতে পারেন।

এলাকায় শুরু হয় মসজিদ নির্মাণ কাজ , ঠিক হয় কবে কখন শুরু হবে প্রথম নামাজ । নিয়োগ হয় ইমাম মোয়াজ্জিন তবে সেই সাথে কিছু মানুষ শুরু করল প্রতিবাদ।

বাইজির টাকায় এলাকায় কোন মসজিদ চলতে পারবে না আর অন্যদিকে একটা পক্ষ দাড়াল এই বলে যে , সে আগে যাই করুক এখন তো আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছে, আল্লাহ তো ক্ষমাশীল তিনি ক্ষমা করতেও পারেন।

এভাবেই একদিন প্রথম আজান হল সেই মসজিদে, আর সেই আজানের শব্দ শুনে দলে দলে বিরোধীরা এসে হামলা করল মসজিদে আর তাতে প্রথম নামাজের দিন থেকেই পরিত্যক্ত হল মসজিদটি।

সেই থেকে আজও পরিত্যক্ত পড়ে আছে মসজিদটি। ঘটনার পর রাগে কষ্টে সেই অনুতপ্ত নারী আর কোনদিন বাড়ির বাইরে আসেনি। ঘরে বসে প্রার্থনা করে আল্লাহর কাছে কৃতকর্মের জন্যে ক্ষমা চেয়েছেন।

এভাবেই চোখের জলে চির বিদায় হয় সেই দুঃখিনী নারীর, আজীবন যাকে নিয়ে খেলেছে প্রকৃতি, যে সমাজ তার ক্ষমা প্রার্থনার পথকে পায়ের তলায় পিষ্ট করেছিল সেই সমাজ তার মৃত্যুর পরও শেষ বিদায় নিয়ে শুরু করল বাদ প্রতিবাদ।

লৌকিক বিচারে হয়তো সেই মসজিদ ঘৃণার বিষয় তবে ক্ষমাশীল আল্লাহ তার অনুশোচনা ক্ষমা প্রার্থনা কবুল করবেন কিনা তা নিশ্চিত নয় কেউই। এমনকি যারা আজও ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেন তারাও, আর যারা যুগে যুগে বিরোধিতা করেছেন তারাও।

তাই হয়তো এতো বিতর্কিত হয়ে আজও কেউ মসজিদটিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার সাহস দেখাননি , সব স্মৃতি চিহ্ন মুছে ফেললেও বাইজির টাকায় কেনা আর গেঁথে যাওয়া সেই জড়াজীর্ণ ইটের গাঁথুনী ঠিকই অক্ষত রেখেছে সবাই।

তাই ইতিহাসের করুন সাক্ষী হয়ে প্রায় দুই শ বছর ধরে এক অসহায় নারীর করুন আর্তনাদ হয়ে টিকে আছে বাইজির মসজিদ।

ফেইজবুক লিংক: গিয়াসউদ্দীন একরাম

আরো দেখুন

Leave a Comment