বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি নিয়ে

সভ্যতা ও সংস্কৃতির অবদানের ফলে আজকের একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব অনেক এগিয়ে। তথ্য যুদ্ধে জড়িত লোকদের তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। প্রথমত, বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে যারা জন্মগ্রহণ করেছিলেন, দ্বিতীয়ত, বিংশ শতাব্দীর সত্তর ও আশির দশকে এবং তৃতীয়ত, যারা বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

বিবেচনার বিষয় হচ্ছে বয়স্ক, মধ্যবয়সী ও তরুণরা কীভাবে একবিংশ শতাব্দীর মুখোমুখি হচ্ছে এবং তার মোকাবেলা করছে। খেয়াল করলে দেখা যায় যে আমাদের চিরচেনা পৃথিবী আর নেই। বিশ্ব পরিবর্তন হচ্ছে যেমনটা হওয়া দরকার আর এ কারণেই পরিবর্তন অনিবার্য। তবে আমরা এখন যে পরিবর্তনটি দেখছি তা কেবল সময়ের পরিবর্তনের বিষয় নয়। এটি একটি অপ্রতিরোধ্য পরিবর্তন, যা অতিমাত্রায় দ্রুত ও এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য তথ্য যুগের সৃষ্টি।

এটা সত্য যে আমরা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মুখোমুখি হচ্ছি। একই সাথে মুখোমুখি হয়েছি তথ্য যুগের প্রবর্তনেরও। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিষয়টি নতুন নয়; এরই মধ্যে আমরা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে অতীতে ছিলাম ও ভবিশ্যতেও থাকব। তবে তথ্য যুগের আগমন সাম্প্রতিক। দুটিকেই আমাদের মোকাবেলা করতে হবে। উপনিবেশিক ব্রিটিশ ও সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান আমলে আমরা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছিলাম। তা আজ আর বলার দরকার নেই। এছাড়াও, ব্রিটিশরা তাদের উপনিবেশিক শাসন বজায় রাখতে আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অঙ্গনে আগ্রাসন চালিয়েছিল।

তবে তাদের বড় সমস্যা ছিল সাম্প্রদায়িকতা। এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার বিষ এতটা ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ত না যদি না ব্রিটিশরা এর সূত্রপাত না করতো। তারা একদিকে ভাষার আধিপত্য চাপিয়ে দিয়েছিল এবং অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক শক্তি তৈরি করেছিল। আমাদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের সর্বশেষ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন পাকিস্তান সৃষ্টি করা এবং পাকিস্তানের দ্বারা বাংলা ভাষার ওপর আক্রমণ এর নগ্ন প্রকাশ।

সংস্কৃতি বলতে কেবল গান, সংগীত, নাটক, সিনেমা বা সাহিত্য বোঝায় না। সংস্কৃতি হলো জীবনের প্রবাহ। সংস্কৃতি জীবন ও জীবনের যোগফলকে বোঝায়। সংস্কৃতির পরিবর্তন আমাদের জীবনের পরিবর্তন। অন্য অর্থে, জীবন সংস্কৃতির পরিবর্তন। সংস্কৃতি আক্রমণ মানে জীবনের ওপর কোন আক্রমণ। তবে এটি লক্ষ্য করা উচিত যে ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যাপক প্রতিবাদ করে বাঙালিরা। পাকিস্তান আমলে আরবিতে বাংলা লেখা, রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করা এবং নজরুলকে নিষিদ্ধ করার মতো সাংস্কৃতিক আক্রমণ ছিল।

পাকিস্তানিরা আমাদের এক জায়গায় আক্রমণ করেছিল এবং আমরা এর প্রতিশোধ নিয়েছিলাম। পাকিস্তানিরা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে আত্মসমর্পণ করেছে। তারা উর্দু বর্ণের পরিবর্তে আরবি বর্ণ ব্যবহার করতো। এর মধ্য দিয়ে ভারতের দুই হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির রীতিকে নষ্ট করা হয়। ফলস্বরূপ ভারতীয় উপমহাদেশকে তারা না করতে পারে আরবীয়, না করতে পারে ভারতীয়। তারা আদিবাসী প্রধান হিসাবে নিজেদের সংস্কৃতি আমাদের উপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। আমরা বিদ্রোহ করে সফল হয়েছি। সেই ধারাবাহিক প্রতিবাদের সাফল্য বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পায়।

তবে একাত্তরে আমরা আক্রমণাত্মক শক্তিকে অতিরঞ্জিত করতে পারি না, আমরা বিজয়ী হয়েও সেই জয়টি বেশিদিন ধরে রাখতে পারি নি। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের সাফল্য ব্যর্থতার পথে যেতে থাকে। আজ প্রমাণিত হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কেউ সত্যিকারের বাঙালি নেতা নয়। তিনিই একমাত্র বাঙালি যিনি বাংলা, বাঙালি ও বাংলা ভাষা বিশ্বের একমাত্র বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করছি। এই গৌরবের প্রাপ্য বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করা প্রথম ব্যক্তি স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৪ সালে তিনি জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় ভাষন দেন এবং বিশ্বে বাংলা ভাষা ও বাংলা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আজ আমরা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে ভীত। এক্ষেত্রে অবশ্যই বঙ্গবন্ধুকে অনুসরণ করতে হবে। তাঁর মতো আমরা যদি পুরো বিশ্বের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারি যে ‘আমি বাঙালী, বাংলাদেশ আমার দেশ, বাঙালি আমার ভাষা’ তাহলে কোনও আগ্রাসনই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।

অতি সম্প্রতি দেশে মৌলবাদের আন্দোলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যা পাকিস্তানি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের এক ভিন্ন রূপের প্রকাশ মাত্র। পাকিস্তানিরা এখনও ষড়যন্ত্র করছে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরে বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার প্রধান চরিত্রটি হারাতে বসেছে। একে পাল্টা বিপ্লব বলা যেতে পারে।

যে নীতিবোধ থেকে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, সেই সংবিধানের নীতি পরিবর্তন করে জাতিকে এক বিপর্যয়কর পরিবর্তনের মুখোমুখি করা হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার শুরুতে যতটা প্রচারণা করা হতো আগ্রাসী সংস্কৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করে তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছি ।

১৯৭২ সালের সংবিধানকে এ দেশের সেরা সংবিধান বলা হয়। সে কারণেই, যতবার সংবিধানের মূল নীতিগুলো সংশোধন করা হয়েছে, সংবিধানের পবিত্রতা নষ্ট করা হয়েছে। সংবিধান থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে বাহাত্তরের সংবিধানের মূল চরিত্রটি হারিয়ে যায়।

প্রকৃতপক্ষে, আমাদের ঘর থেকে আগ্রাসন চলে আসছে। আমরা আমাদের ঘরের সংস্কৃতি পরিবর্তন করছি এবং এটিই সবচেয়ে বড় আগ্রাসন। বাইরের শক্তি কখনই বাংলা ও বাঙালিকে পরাস্ত করতে পারেনি। বাংলা ভাষার উন্নয়নে আমরা যে অর্থ ব্যয় করেছি তা অত্যন্ত নগণ্য। বিএনপির শাসনামলে বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করতে সরকারের নজর কম ছিল।

সেই সময় ভাষা নিয়ে গবেষণার জন্য অর্থের পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল কিন্তু অর্থমন্ত্রণালয় থেকে তা ফেরত আসে। তখন বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠা করতে কোন কাজ করা হয়নি। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিভাগও এই বিষয়ে কাজ করে না বা অর্থ ব্যবহার করে না।

গত এক দশকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশে দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি অগ্রসর হচ্ছে। বর্তমান ধারাটি সন্তোষজনক। ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে বৈষম্য রয়েছে সেখানে ধনী দরিদ্র ও ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে নতুন শ্রেণির উত্থান হয়েছে। তবুও, বাংলাদেশের অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে ভাল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, জাতীয় জীবনে ফিরে এসেছে শান্তি ও শৃঙ্খলা। বন্ধ হয়ে গেছে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম।

সামাজিক নৈরাজ্য, অসদাচরণ, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা অনেক কমেছে। একবিংশ শতাব্দীতে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গঠনের জন্য নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিতে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এ উদ্দেশ্যে ভাষা পরীক্ষাগার স্থাপনের চেষ্টা করা উচিত। বাংলা একাডেমী, চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ ওয়্যারলেস, শিল্পকলা একাডেমিসহ প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা উচিত।

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই বাংলা বিভাগ বাংলা ভাষার কেন্দ্র হওয়া উচিত। যদিও আমাদের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখনও বাংলা বিভাগ চালু করেনি। এটি কোনও পরিস্থিতিতেই কাম্য নয়। তথ্য ও প্রযুক্তি আদান-প্রদানের জন্য সব সরকারী-বেসরকারী সংস্থায় বাংলা ভাষার ব্যবহার প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সদূর প্রসারী পরিকল্পনায় দেশ এগিয়ে চলেছে। তথ্য প্রযুক্তির বিকাশ ও আগ্রাসনের সংস্কৃতি বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেল হবে। বাংলাদেশ এখন কুয়ার শুকনো পানি থেকে বের হয়ে মুক্ত, উদার ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসাবে বিশ্বমানের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রযুক্তির বিকাশের পাশাপাশি সংস্কৃতিও জাগ্রত হয়েছে। এই বিকাশের বিস্তার কেবল শহরই নয়, গ্রামকেও কাঁপিয়ে দিয়েছে। জীবন মানের হিসাবে গ্রামও শহর হতে চলেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই কৃতিত্বকে কোনো কিছুই খর্ব করতে পারবে না। মানুষ এখন খুব সচেতন। শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্ব যে কোন প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সক্ষম। দুর্যোগ ও সঙ্কট-মুক্ত আধুনিক বাংলাদেশের বিজয় অব্যাহত রাখতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বই জাতির জন্য প্রয়োজন।

লেখক: ডা. ফোরকান উদ্দিন আহমেদ, গবেষক ও কলামিস্ট, লেখাটি দ্য ডেইলি স্টার থেকে অনুবাদিত।

আরো দেখুন

Leave a Comment