বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের গল্প

বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের গল্প

রণ মাহমুদ: বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে স্বাধীনতা অর্জনের শুরু থেকেই চ্যালেঞ্জ নিয়ে কীভাবে নিজেদের রূপান্তরিত করেছে- সেটি আলোচনার এখন সঠিক সময়।

স্বাধীনতার শুরুতে পশ্চিমাদের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আখ্যা পাওয়া বাংলাদেশ উন্নয়নের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আজ একটি মাধ্যম আয়ের দেশে রুপান্তরিত হয়েছে।

১৯৭১ সালে স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের মোট জিডিপি ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কম থেকে আজ প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মাথাপিছু জিডিপি ৯০ মার্কিন ডলারের কম থেকে আজ ২ হাজার ২২৭ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

পিপিপির ভাষায়, মোট জিডিপি ৯৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং মাথাপিছু জিডিপি ৫ হাজার ৮১১ মার্কিন ডলার। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৮ তম বৃহত্তম অর্থনীতির আর ২০৫০ সালের মধ্যে ২৩ তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে। জিডিপি (পিপিপি) ২০৩০ সালে ১,৩৪৪ বিলিয়ন ডলার এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ৩,০৬৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে চালিকা শক্তিগুলো হচ্ছে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি, শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি, সেবা খাতে সম্প্রসারণ, তৈরি পোশাক খাত থেকে রফতানি আয় এবং  অভিবাসী শ্রমিকদের প্রেরিত রেমিট্যান্স। এছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমাতে ভূমিকা পালন করেছে।

স্বাধীন হওয়া পর বাংলাদেশের জিডিপিতে প্রায় ৫০ শতাংশ কৃষি উপর নির্ভর ছিল। শিল্প ও সেবা খাতের অবদান ছিল যথাক্রমে ১৩ ও ৩৭ শতাংশ। ২০২০ সালে এই তিন খাতের অবদান ছিল। যথাক্রমে ১৩.৩ শতাংশ ,৫১.৩ শতাংশ ও ৩৫.৪ শতাংশ

খাদ্যশস্য উৎপাদনও চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭১-৭২ সালে ধানের উৎপাদন ছিল ৯.৭৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৭.৪০ মিলিয়ন মেট্রিক টনে দাড়ায়। গমের উৎপাদন ০.১১ মিলিয়ন মেট্রিক টন থেকে প্রায় এক মিলিয়ন মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। বাজার ব্যবস্থাপনা, সেচ সম্প্রসারণসহ কৃষকদের নতুন বীজ-সার প্রযুক্তি গ্রহণ করতে উত্সাহিত করার মাধ্যমে এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।

এছাড়াও গত সাড়ে ৩ দশকে, মাছের উৎপাদন প্রায় ছয় গুণ বেড়ে ৪.৬ মিলিয়ন টন হয়েছে। মাছ ও মাছ জাতীয় পণ্যগুলো রফতানি করা হয়, যদিও এটি অনেক কম। উৎপাদিত মাছ ও মাছের পণ্যগুলোর মাত্র ৩ শতাংশ রফতানি করা হয়।

স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশ উত্তরাধিকার সূত্রে নিম্ন শিল্প ভিত্তিতে অবস্থান করছিল। ১৯৭০ সালের শেষভাগ ও ১৯৮০ সালের  শুরুর দিকে শিল্প খাতে যথেষ্ট প্রবৃদ্ধি অর্জন করে বাংলাদেশ। ১৯৯০ এর দশকে বাংলাদেশ সরকার মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুসরণের ফলে প্রশংসনীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। নব্বই দশকের পর থেকে কয়েক বছর ছাড়া শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি চোখের পড়ার মতো।

সামগ্রিক শিল্প খাতের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের সম্প্রসারণ সবচেয়ে বেশি হয়েছে। এ খাতে প্রায় ৪৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত। অন্যান্য শিল্পের মধ্যে রয়েছে ফার্মাসিউটিক্যালস, চামড়াজাত পণ্য, জাহাজ তৈরি ও ভাঙা, ফুড প্রসেসিং, সিরামিকস, সার, কেমিক্যালস ইত্যাদি। বড় শিল্প ছাড়াও রয়েছে কুটির শিল্প, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ (সিএমই) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য নিরসন ও কর্মসংস্থানে সহায়তা করছে।

এদিকে বাণিজ্য, শিল্প, আর্থিক নীতি ও সেবা খাতে বিস্তৃত নীতিগত সংস্কার করায় প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ছে। সেবা খাতে উদার নীতি গ্রহণ করায় টেলিযোগাযোগ ও আর্থিক খাতগুলোর গুরুত্ব অনেকটা বেড়েছে। সেবা খাতগুলো ক্রমশ জাতীয় অর্থনীতির মূলশক্তি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি উন্নয়নের আকর্ষণীয় একটি বৈশিষ্ট্য হলো সেবা খাতের উন্নয়ন।

১৯৭২-৭৩ সালে রফতানি হয়েছিল প্রায় ৩৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আর ২০১৮-১৯ সালে তা দশগুণ বেড়ে ৪০.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে তা কমে ৩৩.৬৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। কোভিড -১৯ মহামারীর কারণে জুলাই ২০২০-মে ২০২১ সালে রফতানি পরিমাণ ২৮.৯২ বিলিয়ন ডলার ছিল।

দেশের মোট রফতানির প্রায় ৮২ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। পোশাক রফতানি ২০০৫ সালে ৬.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে, তবে মহামারীর কারণে চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ মাসে তা হ্রাস পেয়ে ২৯.৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

তৈরি পোশাক খাত অর্থনীতিতে প্রায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত রূপান্তর এনেছে। এগুলো হলো এক, বৈদেশিক সহায়তার উপর নির্ভরতা কমিয়ে রফতানি আয়ের উপর নির্ভরতা বাড়ানো; দুই, রফতানি কাঠামোর সম্পূর্ণ পরিবর্তন যা মূলত উৎপাদিত পণ্যগুলোর অধীনে থাকে। এবং ‍তিন, নারীদের বেতনসহ কর্মসংস্থান প্রদান তাতে দেশে নারীর ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়ায় অবদান রেখে যাচ্ছে।

শ্রমিক উদ্বৃত্ত দেশ হওয়ায় প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশি চাকরির সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমান। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পযন্ত এ সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখে পৌছাঁয়। অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বার্ষিক রেমিটেন্সের পরিমাণও বহুগুণ বেড়েছে। ১৯৮০ সালে ৩৩৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ২০২০ সালে ২১.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাড়াঁয়। এছাড়া জুলাই-২০২০ থেকে মে-২০২১ সময়কাল তা বেড়ে ২২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

২০১৯-২০২০ অর্থবছরে রফতানি আয় ও আমদানি যথাক্রমে ৫০ শতাংশ এবং ৪০ শতাংশের বেশি ছিল। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিকাশ ও দারিদ্র্য হ্রাসে অবদান রাখছে।

দারিদ্রতার সংখ্যা যথেষ্ট পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭১ সালে যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ থেকে এ সংখ্যা কমে প্রায় ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। করোনা মহামারীর পরে বেড়েছে ৩০ শতাংশের কাছাকাছি।

কয়েকটি প্রধান সামাজিক সূচকে দেখা যায়, বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির বহুগুণ কমেছে। প্রায় ৩ শতাংশ থেকে ১.১  শতাংশে নেমে এসেছে। মাতৃত্ব ও মৃত্যুর হার উভয়ই কমেছে। ১৯৭১ সালে যেখানে গড় আয়ু ৪৬ বছর ছিল সেখানে আজ গড় আয়ু প্রায় ৭৩ বছর।

স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ক্ষেত্রেও যথেষ্ট সাফল্য অর্জিত হয়েছে, যদিও জনগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থার বৈষম্য রয়েছে। এছাড়াও, পানীয় জলের সহজলভ্যতা ও টয়লেট ব্যবহারে হার বেড়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের উপস্থিতি বৃদ্ধিসহ উভয় স্তরে লিঙ্গ সমতা বেড়েছে। মানব উন্নয়ন সূচক (এইচডিআই) ১৯৯০ সালে ০.৩৯৪ থেকে বেড়ে ২০১৯ সালে ০.৬৩২ হয়েছে।

দেশের সমবৃদ্ধি ও বিকাশ হওয়া সত্বেও অবকাঠামোগত ঘাটতিসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা এখনো বিদ্যমান রয়েছে। বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাতের স্থবিরতা বিশেষ করে বেসরকারী খাতকে প্রভাবিত করে; উপার্জন ও স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য; শিক্ষার নিম্নমান, বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, দুর্বল পর্যবেক্ষণ ও তদারকি, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে।

অন্যান্য দেশগুলোর মতো মহামারী দ্বারা সৃষ্ট সংকট প্রবৃদ্ধি ও  বিকাশ আরও বাধাগ্রস্ত করছে। মহামারির কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ; বেকারত্ব বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ; নতুন করে প্রায় ২০ লাখ লোককে দরিদ্রতার মধ্যে যুক্ত করা হয়েছে। কোভিড -১৯ ছাড়াও কার্ডিওভাসকুলার, ডায়াবেটিস এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মতো মারাত্মক রোগী ও জনগণের স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয় এ সময়।

তবে সরকারের ১ ট্রিলিয়ন টাকারও বেশি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা যা জিডিপির প্রায় ৩.৫ শতাংশ, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিফিনান্সিং ও ঋণের স্কিমগুলো স্থগিত রাখায় করোনায় ক্ষতিগ্রস্থদের সংকট সমাধানে সহায়ক হয়। তবে প্যাকেজ বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা যায়নি।

মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে গড়ে উঠতে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার জন্য সরকারের উন্নয়নের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করা জরুরি ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *