বরেণ্য অভিনেতা আবদুল কাদেরকে নিয়ে তাদের স্মৃতিচারণ

বরেণ্য অভিনেতা আবদুল কাদেরকে নিয়ে তাদের স্মৃতিচারণ

আবদুল কাদেরের মতো রসবোধ সম্পন্ন মানুষ কমই ছিল মিডিয়ায়। এতটা রসবোধ নিয়ে কম মানুষই জন্মগ্রহণ করে থাকে। তার রসবোধ যেকোনো মানুষের মন ভালো করে দিতে পারত। তার মৃত্যুতে শোকে ভাসছে অভিনয় অঙ্গণ।

ঢাকার মঞ্চে অসাধারণ কিছু নাটকে দীর্ঘদিন অভিনয়ের পাশাপাশি অসংখ্য টেলিভিশন নাটকে আবদুল কাদেরের ছিল সরব উপস্থিতি। করেছেন চলচ্চিত্র ও মডেলিংও।

ক্যান্সারের কাছে হার মেনে ২৬ ডিসেম্বর শনিবার সকালে চির বিদায় নিয়েছেন জনপ্রিয় অভিনেতা আবদুল কাদের। তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন তার সহশিল্পীরা।

ফেরদৌসী মজুমদার:

মঞ্চে আবদুল কাদেরের মত অভিনয়ের প্রতিভা কম দেখেছি। মঞ্চের সংলাপ বলার ক্ষেত্রে ওর স্মরণশক্তির তুলনা হয় না। মঞ্চে উঠামাত্র দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখত সে।

ওর মত রসবোধ সম্পন্ন মানুষ কমই দেখেছি। এতটা রসবোধ নিয়ে কম মানুষই জন্মায়। ওর রসবোধ যেকোনো মানুষের মন ভালো করে দিতে পারত।

আসাদুজ্জামান নূর: 

এত প্রিয় একজন মানুষের চলে যাওয়ায় আমার মনটা বিষণ্ণ লাগছে। আবদুল কাদের এমন একজন মানুষ, তাকে দেখলেই মন ভালো হয়ে যেত। মন খারাপ করে থাকার কোনো উপায় থাকত না। আমি তাকে কোনোদিনও কারও বিরুদ্ধে কিছু বলতে শুনিনি। এটা ছিল তার বড় গুণ।

সবচেয়ে বড় কথা- বড় হৃদয়ের মানুষ ছিল সে। আর পারিবারিকভাবে ছিল একজন মায়ার মানুষ। স্ত্রী, সন্তান, নাতী-নাতনীদের ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখত। আমি আমার দীর্ঘদিনের সহকর্মীকে হারালাম।

রামেন্দু মজুমদার: 

অভিনয় ও সাংগঠনিক ক্ষমতা আবদুল কাদেরের দুটিই ছিল। যে কারণে দীর্ঘ দিন আমার নাটকের দলে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছে।মঞ্চে যখন যে চরিত্র তাকে দেওয়া হত সেটাই করত। সব ধরণের চরিত্রে অভিনয় করতে পারত। সব শিল্পী এটা পারে না। সে পারত। অভিনয় গুণটা অসম্ভব রকমের ছিল।

তার বড় একটি গুণ ছিল একটি মঞ্চ নাটকের পুরোটা মুখস্থ বলতে পারত। এটা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। কেবল নিজের সংলাপ মুখস্থ পারত তা না। পুরো নাটকের সংলাপ মুখস্থ বলা কঠিন কাজ। এটা সে পারত।

আবুল হায়াত: 

নাটকের জগতে শিল্পী অনেক আছেন। আবদুল কাদের ছিল অনেক বড় মাপের শিল্পী। তার চেয়েও বড় কথা- সে অনেক ভালো মানুষ ছিল। নাটকের জগতে তার মতো ভালো মানুষ কমই দেখেছি। তার মতো ভালো মানুষের এখানে খুব অভাব।

আবদুল কাদের সবার আপন মানুষ ছিল। কাউকে ছোট করে, কাউকে দোষারোপ করে কিছু বলত না। এটা তার চরিত্রের মধ্যে ছিল না। সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে চাইত সবসময়। আর ছিল সরল মানুষ। শিশুর মত সরল ছিল তার ভেতরটায়। দেখা হলেই চিরদিনের সুন্দর হাসি হাসত। সেই হাসিমুখ আর দেখতে পারব না।

দিলারা জামান: 

খুব কাছের মানুষকে হারালাম। আমরা শিল্পীরা তো সব মিলিয়ে একটি পরিবারই। পরিবারের একজন চলে গেল। বড় অসময়ে চলে গেল আবদুল কাদের। একজন আবদুল কাদেরের শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। বড় মাপের একজন শিল্পীকে আমরা হারালাম।

শিল্পীর বাইরে বড় একজন কর্মকর্তা ছিল। কিন্তু শিল্পের প্রতি মনটা পড়ে থাকত সবসময়। তাই তো অভিনয় কখনও ছাড়েনি। অভিনয়ে একটু বিরতি পড়লেই ওর হাসিমুখ আর গল্প শুরু হত। এতটাই হাসাতে পারত, যা সবার পক্ষে সম্ভব নয়।

ড. ইনামুল হক: 

আবদুল কাদের ছিল জাত অভিনেতা। যেকোনো চরিত্রে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারত। অভিনয়টাকে খুব ভালোবাসতো। অভিনয়ের ক্ষুধা ওকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়াত। একজন জাত শিল্পী না হলে এমনটা সম্ভব না।

মঞ্চের জন্য নিবেদিত মানুষ ছিল। আমি মনে করি ঢাকার মঞ্চকে বড় কিছু দিয়েছিল সে। হঠাৎ করে শুনতে পাই তার ক্যান্সার হয়েছে। এত দ্রুত ক্যান্সার তাকে নিয়ে যাবে চিরদিনের জন্য ভাবিনি। মানুষকে এত করে আনন্দ দিতে পারত। যতদিন বাঁচব খুব করে মিস করব তাকে।

হানিফ সংকেত: 

‘আব্দুল কাদেরের চলে যাওয়া আমাদের জন্য খুবই কষ্টের খবর। আমরা গভীরভাবে শোকাহত। অক্টোবরের মাঝামাঝি সর্বশেষ তিনি “ইত্যাদি”র শুটিং করেছিলেন। সে সময়ও তাকে দেখে খুব অসুস্থ মনে হয়েছিল। আমি তাকে বললাম, কী হয়েছে? উনি বললেন, ‘কিছু না। এরপর উনি বললেন, আমার শরীরটা খুব একটা ভালো না, দোয়া করবেন।’

কাদের ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের প্রায় তিন দশকের সম্পর্ক। উনি অত্যন্ত শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপন করতেন। দীর্ঘ তিন দশক তিনি আমাদের মামা-ভাগ্নে পর্বটা করেছেন এবং খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। ভাবি কিছুদিন আগে আমাকে বলেছিলেন, অসুস্থতা ও করোনার কারণে আমরা যেন তাকে “ইত্যাদি’র শুটিং করতে না করি। কিন্তু উনি বলেছিলেন, না, আমি ইত্যাদি করবই। উনি ঠিকই সময় মতো সেটে আসতেন। শুটিংয়ে মাঝেমধ্যেই খাবার নিয়ে আসতেন, ভাবি করে দিতেন।’

‘উনার সঙ্গে আমার সবশেষ কথা হয়েছে, উনি যখন চেন্নাই গেলেন। দেশে ফিরেও বিমানবন্দরে নেমে কথা হয়েছে ভিডিও কলে। অনেক কান্না করলেন। আমাকে বললেন, হানিফ ভাই জানি না আপনার সঙ্গে আর দেখা হবে কি না। দোয়া করবেন, যেন দেখা হয়। তার চলে যাওয়া আমাদের জন্য বড় ক্ষতি হয়ে গেল। অন্যদের কী হয়েছে জানি না, আমি আমাদের পরিবারের একজনকে হারালাম।’

বরেণ্য অভিনেতা আবদুল কাদের

বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে: 

দীর্ঘদিন ক্যন্সারে আক্রন্ত আক্রান্ত হয়ে ২৬ ডিসেম্বর সকালে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান ।(ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্ন

আবদুল কাদেরের বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। তিনি স্ত্রী এবং এক ছেলে ও মেয়েকে রেখে গেছেন। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে শোবিজ অঙ্গনে।

অভিনেতা আবদুল কাদের ১৯৫১ সালে মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার সোনারং গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

আবদুল জলিল ও আনোয়ারা খাতুনের সন্তান তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেন তিনি।

কর্মজীবন শুরু হয় শিক্ষকতা দিয়ে। তারপর ১৯৭৯ সাল থেকে ‘বাটা’ কোম্পানিতে চাকরি করেন। সেখানে ছিলেন ৩৫ বছর।

হুমায়ূন আহমেদ রচিত ‘কোথাও কেউ নেই’ ধারাবাহিক নাটকে ‘বদি’ চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক পরিচিতি পান আবদুল কাদের।

জনপ্রিয় এই অভিনেতা একইসঙ্গে টিভি নাটক, বিজ্ঞাপনচিত্র ও সিনেমায় অভিনয় করেছেন।দেশের অন্যতম পরিচিত মঞ্চ নাটকের দল ‘থিয়েটার’র সদস্য হয়ে দলটির ৩০টি প্রযোজনায় অভিনয় করেছেন তিনি।

যেগুলোর মধ্যে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়; তোমরাই; স্পর্ধা; মেরাজ ফকিরের মা; দুই বোন এবং এখনো ক্রীতদাস উল্লেখযোগ্য।

তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিত ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *