বঙ্গবন্ধু বিপিএলের চ্যাম্পিয়ন ট্রফি পেলেন বিদেশি অধিনায়ক !

মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ১৭ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু বিপিএল ফাইনালে ৪ উইকেটে ১৭০ রান করেছিল রাজশাহী রয়েলস। ওই রান টপকাতে গিয়ে ১৪৯ রানে থেমে মুশফিকুর রহিমের খুলনা টাইগার্স হেরেছে ২১ রানে। নতুন আদলে শেষ হয় সপ্তম আসরে শিরোপা। চ্যাম্পিয়ান হয় আন্দ্রে রাসেলের রাজশাহী। ট্রফি হাতে উল্লাস করেন রাসেলরা।  

আন্দ্রে রাসেল যখন উইকেটে নামেন, মিরপুর শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ভরপুর গ্যালারি টইটুম্বর। নেমেই বুঝি ঝড় তুলবেন এ ক্যারিবিয়ান তবে এদিন এ ক্যারিবিয়ানের সঙ্গে ব্যাট করতে নেমে প্রথমে ঝড় তুললেন পাকিস্তানি অলরাউন্ডার মোহাম্মদ নাওয়াজ।

পরে রাসেলও ছক্কা হাকিয়েছেন। শেষ তিন ওভারে তারা যা রান এনেছেন, তাতেই তৈরি হয়ে যায় বিরাট ব্যবধান। বল হাতেও নাওয়াজ-রাসেলই দাপিয়েছেন খুলনাকে। মুশফিকুর রহিমদের থামিয়ে তাদের শিরোপা জেতা শেষ দিকে হয়েছে অনেকটাই সহজ।

লক্ষ্য তাড়া করতে শুরুটা করতে পারেনি মুশফিকের খুলনা। ১১ রানেই ছন্দে থাকা দুই ওপেনার নাজমুল হোসেন শান্ত ও মেহেদী হাসান মিরাজকে হারিয়ে দিশাহারা হয় খুলনা। শুরুতেই চাপে পড়ে যায় দলটি। তবে তৃতীয় উইকেটে রাইলি রুশোকে ৭৪ রানের দারুণ এক জুটি গড়ে সে চাপ সামলে নেন শামসুর রহমান। পরে ২০ রানের ব্যবধানে এ দুই সেট ব্যাটসম্যানসহ ৩ উইকেট হারালে আবারও চাপে পড়ে যায় খুলনা।

ফাইনালে নামার আগে খুলনার মুশফিকুর রহিম ও রাজশাহীর আন্দ্রে রাসেল

তখনও উইকেটে টিকে ছিলেন মিস্টার ডিপেনডেবল মুশফিক। এবারের আসরে দুর্দান্ত ব্যাট করার নৈপুণ্য দেখিয়েছেন তিনি। রবি ফ্র্যাইলিঙ্ককে নিয়ে ভালো কিছুর ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন মুশফিক তবে  আন্দ্রে রাসেলের বলে বোল্ড হয়ে গেলে কার্যত শেষ হয়ে যায় তাদের আশা। এরপর ফ্র্যাইলিঙ্ক ফিরে গেলে হার নিশ্চিত হয়ে যায় তাদের। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ২০ ওভারে ৮ উইকেটে ১৪৯ রান করে থামে খুলনা।

দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৫২ রান করেন শামসুর। ৪৩ বলে ৪টি চার ও ২টি ছক্কায় এ রান করেন শামসুর। রুশোর ব্যাট থেকে আসে ২৬ বলে ৩৭ রান। অন্যদিকে রাজশাহীর পক্ষে দারুণ বোলিং করেছেন মোহাম্মদ ইরফান। ৪ ওভার বল করে ১৮ রানের খরচ করে নেন ২ উইকেট। ইনিংসের ১৯তম ওভারে বল করতে এসে কোন রান দেননি এ পেসার। এছাড়া রাসেল ও রাব্বি শিকার করেন ২টি করে। 

এর আগে এদিন টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে শুরুটা ভালো হয়নি রাজশাহীর। নকআউট পর্বে আরও একবার ব্যর্থ হলো লিটন কুমার দাস ও আফিফ হোসেন ধ্রুব জুটি। অথচ গ্রুপ পর্বে নয় ম্যাচে ছয়বার পঞ্চাশোর্ধ্ব রানের জুটি গড়েছেন এ জুটি। অবশ্য গ্যালি থেকে দৌড়ে শর্ট থার্ডম্যানে আফিফের ক্যাচ দারুণ দক্ষতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে লুফে নেন মেহেদী হাসান মিরাজ।

এরপর দলের হাল ইরফান শুক্কুরকে নিয়ে ধরেন লিটন। ৪৯ রানের জুটিও গড়েন। তবে নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি। তার ব্যাট থেকে ২৫ রান আসলেও খরচ করতে হয়েছে ২৮ বল। যা তার নামের পাশে বড্ড বেমানান। তবে সে ঘাটতি পুষিয়ে দেন শুক্কুর। ৩৫ বলে ৫২ রানের দারুণ ঝকঝকে এক ইনিংস খেলে রানের চাকা সচল রাখেন। ৬টি চার ও ২টি ছক্কায় সাজান এ উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান।

বিপিএল এর ফাইনালে ব্যাট কররছেন খুলনার অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম

শুক্কুরের বিদায়ের পর মাঠে নামেন আন্দ্রে রাসেল। শুরুতে কিছুটা দেখে শুনেই খেলেন। প্রথম ছক্কাটিও আসে মিস হিট থেকে। এরপর শহিদুলের বলে ব্যক্তিগত ৭ রানে নাজমুল হোসেন শান্তর হাতে একটি লাইফও পান তিনি। তবে রাসেল দেখে শুনে খেললেও শুরু থেকেই আগ্রাসী মোহাম্মদ নাওয়াজ। রবি ফ্র্যাইলিঙ্কের করা ১৮তম ওভারে দুটি করে ছক্কা ও চারে ২১ রান আসে তার সৌজন্যেই। এরপর পার্টিতে যোগ দেন রাসেলও।

পরের ওভারে মোহাম্মদ আমিরের কাছ থেকে এক ছক্কা ও দুই চারে ১৮ রান আদায় করেন নেন। এ দুই ব্যাটসম্যানের আগ্রাসনে শফিউল ইসলামের করা শেষ ওভারেও আসে ১৫ রান। ফলে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৪ উইকেটে ১৭০ রান তোলে দলটি। মূলত শেষ তিন ওভারের আগ্রাসনেই লড়াকু সংগ্রহ পায় রাজশাহী। শেষ তিন ওভারে আসে ৫১ রান।

আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে এদিন রাসেলকেও ছাড়িয়ে যান নাওয়াজ। মাত্র ২০ বলে ৪১ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলেন তিনি। ৬টি চার ও ২টি ছক্কায় এ রান করেন তিনি। ১৬ বলে ২৭ রানের ইনিংস খেলেন রাসেল। ৩টি ছক্কায় এ রান করেন এ ক্যারিবিয়ান। খুলনার পক্ষে ৩৫ রানের খরচায় ২টি উইকেট পেয়েছেন মোহাম্মদ আমির।

প্রথম বিদেশি অধিনায়ক হিসেবে শিরোপা জিতলেন রাসেল

টুর্নামেন্ট সেরা রাসেল গড়লেন ইতিহাসও

বিপিএলের আগের ছয় আসরের সবকটিতে শিরোপা জয়ী দলের অধিনায়ক ছিলেন বাংলাদেশি। এবার সেই ধারায় ছেদ টানলেন ভিনদেশি রাসেল। মাশরাফি বিন মর্তুজা, সাকিব আল হাসান ও ইমরুল কায়েসের পর চতুর্থ অধিনায়ক হিসেবে বিপিএলের শিরোপা জিতলেন টি-টোয়েন্টির অন্যতম এই ফেরিওয়ালা।

বিপিএলের ইতিহাসে আপনিই প্রথম বিদেশি অধিনায়ক হিসেবে শিরোপা জিতেছেন আনেদ্র রাসেল। ক্যারিবিয়ান তারকার বিস্ময়মাখা জিজ্ঞাসা, ‘সত্যি কি তাই?’ বাংলাদেশের ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি আসর বিপিএলের শিরোপা প্রথমবারের মতো উঠেছে কোনো বিদেশি অধিনায়কের হাতে। রাসেলের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু বিপিএলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে রাজশাহী রয়্যালস। অধিনায়ক হিসেবে এটি-ই তার প্রথম শিরোপা।

সংবাদ সম্মেলনে আসার আগেই অবশ্য আরও একটি সুসংবাদ পেয়ে যান ওয়েস্ট ইন্ডিজের অলরাউন্ডার। কাগজে-কলমে অধিনায়কের দায়িত্বে থাকা রাসেল মাঠেও ব্যাটে-বলে দারুণ অবদান রেখে ফাইনালের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার তো জিতেছেন-ই, আসর জুড়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের দীপ্তি ছড়িয়ে এবারের বিপিএলের ‘ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট’ও তিনিই নির্বাচিত হয়েছেন।

ফাইনালের নায়ক রাসেল অলরাউন্ড নৈপুণ্য আর নেতৃত্ব- দুয়ের সমন্বয়ে জিতেছেন টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার। এবার ১৩ ম্যাচ খেলে তিনি ব্যাট হাতে উইকেটে যাওয়ার সুযোগ পান ১১টিতে। ৫৬.২৫ গড়ে এবং বিধ্বংসী ১৮০ স্ট্রাইক রেটে তার সংগ্রহ ২২৫ রান। রাসেল বল করেছেন ১২ ম্যাচে। ২৫.৬৪ গড়ে নিয়েছেন ১৪ উইকেট। ওভারপ্রতি অবশ্য রান দিয়েছেন বেশি, ইকোনমি ৮.৭৫।

রাসেলের কল্যাণেই বঙ্গবন্ধু বিপিএলের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছিল রাজশাহী। গেল বুধবার দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে এক পর্যায়ে দলটির দরকার ছিল ৩১ বলে ৮২ রান। চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের বিপক্ষে সেই অসম্ভব সমীকরণ মিলিয়েছিলেন তিনি। প্রতিপক্ষ বোলারদের ওপর তাণ্ডব চালিয়ে ২ চার ও ৭ ছক্কায় ২২ বলে ৫৪ রানে অপরাজিত থেকেছিলেন রাসেল। ফলে ৪ বল হাতে রেখে ২ উইকেটের নাটকীয় জয় পেয়েছিল রাজশাহী। সেই চোখ ধাঁধানো ইনিংসের রেশ থাকতে থাকতেই ফাইনাল জিতে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছেন রাসেল।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

রাজশাহী রয়্যালস:

২০ ওভারে ১৭০/৪ (লিটন ২৫, আফিফ ১০, শুক্কুর ৫২, শোয়েব ৯, রাসেল ২৭*, নাওয়াজ ৪১*; আমির ২/৩৫, ফ্র্যাইলিঙ্ক ১/৩৩, তানবির ০/১১, শফিউল ০/৩৮, মিরাজ ০/২৭, শহিদুল ১/২৩)।

খুলনা টাইগার্স:

২০ ওভারে ১৪৯/৮ (শান্ত ০, মিরাজ ২, শামসুর ৫২, রুশো ৩৭, মুশফিক ২১, নজিবুল্লাহ ৪, ফ্র্যাইলিঙ্ক ১২, শহিদুল ০, শফিউল ৭*, আমির ১*; ইরফান ২/১৮, রাহী ১/২৪, রাসেল ২/৩২, মালিক ০/১৫, নাওয়াজ ১/২৯, রাব্বি ২/২৯)।

ফলাফল: রাজশাহী রয়্যালস ২১ রানে জয়ী।

ম্যান অব দ্য ম্যাচ: আন্দ্রে রাসেল (রাজশাহী রয়্যালস)।

ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট: আন্দ্রে রাসেল (রাজশাহী রয়্যালস)

উজ্জ্বল দেশি ক্রিকেটাররা

বঙ্গবন্ধু প্রিমিয়ার লিগ-বিপিএলে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করছেন বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা। তাদের ধারাবাহিক পারফরমেন্স নিচে দেওয়া হলো-

মুশফিকুর রহিম (খুলনা টাইগার্স):

এবারই প্রথম বিপিএলের ফাইনাল খেলছেন। তার গড় ৭৮.৩৩, যা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অনেক বেশি। স্ট্রাইক রেটও বেশি, যেটি ১৫০ ছুঁই ছুঁই। ১৩ ইনিংসে ৪৭০ রান করেছেন মিস্টার ডিপেন্ডেবল।

ইমরুল কায়েস (চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স) :

তিনি এবার বিপিএলকে নিজেকে প্রমাণের মঞ্চ হিসেবে নিয়েছেন। ১৩২ স্ট্রাইক রেটে ৪৯ গড়ে ৪৪২ রান তুলেছেন এ ওপেনার। ৪টি ফিফটি করেছেন তিনি।

লিটন দাস (রাজশাহি রয়েলস):

ফাইনালর একটি দৃশ্য

এবারের বিপিএলে তিনি অন্যতম প্রভাব বিস্তারকারী পারফর্মার। ১৪ ম্যাচ খেলে রান তুলেছেন ৪৩০। গড় ৩৩, স্ট্রাইক রেট ১৩৯.২৬। ৪৬টি চার ও ১৪টি ছক্কা মারা এ উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান ৩টি ফিফটি হাঁকিয়েছেন।

মোস্তাফিজুর রহমান (রংপুর রাইডার্স) :

বঙ্গবন্ধু বিপিএলে ১২ ম্যাচে ৩১২ রান দিয়ে ২০ উইকেট নিয়েছেন এ ফাস্ট বোলার। তার বোলিং গড় ১৫.৬০। ইকোনমি রেট ৭।

রুবেল হোসেন (চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স) :

 রুবেল ও মোস্তাফিজ এ বিপিএলের ফাইনালের আগ পর্যন্ত যৌথভাবে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি (২০)। রুবেলের ইকোনমি রেট ৭.৩১। তিনি রান দিয়েছেন ৩৫৭। তার গড় ১৭.৮৫।

মেহেদী হাসান রানা (চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স):

রানাকে ক্রিকেট বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের আসরের বিস্ময়। ১০ ম্যাচে ১৮ উইকেট নিয়েছেন এ পেস বোলার। বোলিং গড় ১৮.৮৯। একটি ম্যাচে ২৩ রান দিয়ে ৪ উইকেট নিয়েছেন তিনি।

সৌম্য সরকার (কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স) :

চ্যাম্পিয়ান রাজশাহী রয়েলসের হাতে ট্রফি

বাংলাদেশ ক্রিকেটারদের মধ্যে অন্যতম পারফর্মার ছিলেন তিনি। ১২ ম্যাচে ৩৩১ রান করেছেন তিনি। পাশাপাশি ১২ উইকেট নিয়েছেন এ মিডিয়াম পেসার।

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ (চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স) :

ইনজুরির কারণে তুলনামূলক কম ম্যাচ খেলেছেন মাহমুদউল্লাহ। ৭ ম্যাচে রান করেছেন ২০১। কিন্তু তার পরিসংখ্যান টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সঙ্গে মানানসই। স্ট্রাইক রেট ১৭০, গড় ৪০।

নাজমুল হোসেন শান্ত (খুলনা টাইগার্স)  :

এবার চমক দেখিয়েছেন শান্ত। ২০১৯-২০ বিপিএলে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রান নেয়া ব্যাটসম্যান তিনি। ৫৭ বলে করেছেন অপরাজিত ১১৫ রান, যা কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটারের এবারের আসরে একমাত্র সেঞ্চুরি।

আরো দেখুন

Leave a Comment