‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির ৫১ বছর

বঙ্গবন্ধু উপাধি

বাঙালি জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ  দিন ২৩ ফেব্রুয়ারি,  ১৯৬৯ সালের এদিনে মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধু উপাধি। ২০২০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি স্বাধীনতার স্থপতি ও জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির ৫১ বছর পূর্ণ হলো।

বঙ্গবন্ধু উপাধি একদিনে আসেনি, বাঙালিকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘদিন লড়াই ও সংগ্রামের পর বাঙালি আপন করে নিয়েছিল শেখ মুজিবকে । বঙ্গবন্ধুও কার্পণ্য করেননি তার প্রতিদান দিতে, আন্দোলন সংগ্রামে জীবনের ১৩টি বছর কাটিয়েছেন কারাগারের ভেতরে।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক:

১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে ফিরে আসার পর ২৩ ফেব্রুয়ারি তাঁকে গণসংবর্ধনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে গণসংবর্ধনায় শেখ মুজিবুর রহমানকে কী উপাধিতে ভূষিত করা হবে তা নিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলার নয়নমণি, বঙ্গশার্দুল, অবিসংবাদিত নেতা, বাঙালির মুক্তিদাতাসহ বিভিন্ন নামের প্রস্তাব আসলেও কোনটাই মনপূত হয়নি উপস্থিত নেতাদের। এরপর রেসকোর্স ময়দানে শুরু হয় গণসংবর্ধনা, সেখানে সমবেত ছিলেন ১০ লাখেরও বেশি জনতা।  

সমবেত লাখো জনতার সামনে তৎকালীন ডাকসুর ভিপি ও সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘‘বঙ্গবন্ধু’’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

সমবেত লাখো জনতা তাৎক্ষণিক সম্মতি:

সমবেত লাখো জনতা তাৎক্ষণিক সম্মতি জানিয়ে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দেয়। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের আপোষহীন নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ভূষিত হন ‘‘বঙ্গবন্ধু’’ নামের নতুন উপাধিতে।

শেখ মুজিবুর রহমানের ১৩ বছর জনগণের মুক্তির জন্য পাকিস্তান জেলে থাকার যে ঘটনার জন্ম দিয়েছেন তা বিশ্বের আর কোনও নেতা জনগণের জন্যে এতো ত্যাগ স্বীকার করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি।

গণসংবর্ধনায় উপাধি প্রদান নিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি হয়েছিল। গোটা জাতি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা স্থাপন করেছিলো।


বাঙালিদের স্বকীয়তার বহিঃপ্রকাশ:

যে মানুষটি শুধুমাত্র পূর্ব বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, স্বাধিকারের জন্য তার জীবনের মূল্যবান গুরুত্বপূর্ণ সময় জেলে কাটিয়েছেন; অকুতোভয় যার প্রতিটি উচ্চারণ, তাকে গণ উপাধিতে ভূষিত করার বিষয় সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়ায়।

ঐতিহাসিক কারণেও উপাধি দেয়া ছিলো ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদের কর্তব্য। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানকে নতুন উপাধিতে ভূষিত করার যা পুরো জাতি স্বানন্দে গ্রহণ করেন। যা জাতি হিসেবে বাঙালিদের স্বকীয়তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

অনেক নামে তাকে ডাকা হলেও ইতিহাস হয়ে যায় সেদিনের তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত গণসংবর্ধনার বঙ্গবন্ধু উপাধিটি।

২৩ ফেব্রুয়ারি গণসংবর্ধনায় দশ লাখেরও বেশি মানুষের রায় নিয়ে তৎকালীন ডাকসুর ভিপি ও সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি তোফায়েল আহমেদ ঘোষণা করেন ‘আজ থেকে তিনি আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই থেকে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে রচিত হলো নতুন ইতিহাস।

ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য শব্দ ‘বঙ্গবন্ধু’:

বাঙালির ইতিহাসে অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি। যার অর্থ বাংলার জনগণের বন্ধু। ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটির অর্থ বিশাল! তিনিই বঙ্গবন্ধু যিনি ভালোবাসেন, শুধু ভালোবাসেন না ভালোবাসার জন্য আপোষহীন আমৃত্যু সংগ্রাম করেন, যার ভালোবাসা নির্লোভ-নিঃস্বার্থ।

শেখ মুজিবুর যখন বঙ্গবন্ধু তখন তিনি হয়ে ওঠেন বাংলার প্রকৃতির বন্ধু, বাংলার ভাষা কৃষ্টি সংস্কৃতির বন্ধু, বাঙালি জাতীয়তাবাদের বন্ধু, জাতীয়তাবোধের বন্ধু, মুক্তিসংগ্রামের বন্ধু তাই একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানই ‘বঙ্গবন্ধু’উপাধির যোগ্য বলে তৎকালিন ছাত্র সমাজ ও সাধারণ মানুষ মনে করেন।  

বঙ্গবন্ধু যৌবনে কাটিয়েছেন কারাগারে, মৃত্যু ভয় যার কাছে ছিল তুচ্ছ; বঙ্গবন্ধু বলতেন, আমি ক্ষুদিরামের বাংলার মুজিব, সূর্য সেনের বাংলার মুজিব; বাংলার মানুষের জন্য আমি হাসিমুখে জীবন দিতে পারি। সেই নেতাকেই এ জন্য এ উপাধি দিয়ে বরণ করে নেয় বাংলার আপামোর জনতা।

কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি ঋণের বোঝা হালকা করতে জাতির পক্ষ থেকে প্রিয় নেতাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়। রেসকোর্স ময়দান প্রকম্পিত করা ১০ লাখের বেশি মানুষ দু’হাত তুলে সমর্থন জানায় ছাত্র নেতা তোফায়েল আহমেদকে।

লাখো জনতার পক্ষে তোফায়েল আহমেদ:

তোফায়েল আহমেদের ভাষায়, বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান হাজার বছরের মহাপুরুষ, লাঞ্চিত-বঞ্চিত বাঙালির নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’উপাধিতে ভূষিত করা হলো। আজ থেকে তিনি আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান…। লাখো জনতার কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হলো জয় বঙ্গবন্ধু…।

এরপর বক্তৃতা করেন ‘বঙ্গবন্ধু’ শেখ মুজিবুর রহমান। সে সময় বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতাও ঘোষণা করা হয়। তখন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা রূপে আত্মপ্রকাশ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালিরা তাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে স্বাধীনতা অর্জন করে।

জীবন্ত কিংবদন্তী শেখ মুজিব:

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ যাকে মহাত্মা উপাধি দিয়েছিলেন সেই মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, শেরে বাংলা একে ফজলুল হকসহ পৃথিবীতে অনেকেই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উপাধি পেয়েছেন।

তবে ফাঁসির মঞ্চ থেকে মুক্ত হয়ে, গণমানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে, এমন আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে কেউ উপাধি পাননি। এরপর থেকেই জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে গেলেন বাঙালির প্রিয় ‘বঙ্গবন্ধু’।

আরো দেখুন

Leave a Comment