প্রতিদিন একটি আপেল খেলে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে না কতটুকু সত্যি?

আপেল

মিষ্টি ও রসাল ফল আপেল সারা বিশ্বে সবার কাছে পরিচিত পুষ্টি প্রদানকারী একটি ফল হিসেবে। খেতে খুবই সুস্বাদু। সহজে খিদে কমিয়ে দেয়। অন্য ফাস্টফুড বা মিষ্টি খাবার খাওয়ার থেকে আপেল খেয়ে খিদে মেটানো শরীরের জন্য অনেক উপকারি।

আপেল একধরনের মিষ্টি ফল। আপেল রোসাসি গোত্রের ম্যালিয়াস ডমেস্টিকা প্রজাতিভুক্ত। কারণ আপেলে থাকে ৭০-১০০ ক্যালরি আছে। আপেলে ফাইবার, ভিটামিন এ, ভিটামিন ই, ভিটামিন সি সহ থাকে পানিও, যা মানবদেহে পানির ঘাটতি দূর করে। আছে ফ্ল্যাভানয়েড যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। সবুজ, সোনালী, লাল, যেকোনো রকম আপেল থেকেই এ পুষ্টিকর উপাদানগুলো পাওয়া যায়।

যে কারণে উপকারি ফল আপেল:

আপেল রক্তের চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ফলে ডায়বেটিস হওয়া থেকে রক্ষা করে শরীরকে। আপেল খিদেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে থাকে। বিভিন্ন রকম ক্যান্সার হওয়া থেকে শরীর কে রক্ষা করে আপেল। প্রচুর ফাইবার থাকায় হজম সহায়ক। তাই বাওয়েল পরিষ্কার রাখে কোলন ক্যান্সার হতে দেয় না। আপেল লিভার ও গলব্লাডার পরিষ্কার রাখে।

দিনে একটি থেকে দুইটি আপেল খেলে হার্টের সমস্যা কমে। গবেষণা থেকে পাওয়া গেছে যে– দিনে একটি আপেল খেলে রক্তের ক্ষতিকর এলডিএল কোলেসটরেল কমতে থাকে। হার্টের অসুখ থেকে রক্ষা, ফুসফুসকে রক্ষাসহ আপেল শরীরের ওজন কমায় ও তা নিয়ন্ত্রণ করে থেকে। এতে অন্যান্য ফলের তুলনায় প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আছে। আপেল পেশী টনিক, মূত্রবর্ধক, জোলাপ, অ্যান্টিডাইয়েডরিল।

ইউরোপে আপেলের বাগান থেকে তাজা আপেল নিচ্ছেন তরুণী

আপেলে পেকটিন নামক ফাইবার থাকে যা সহজে তরলে মিশে যায়। এই ফাইবার অন্ত্র নালিতে কোলেসটরেল জমতে দেয় না। শরীর থেকে কোলেসটরেল খরচ করে কমাতে শরীরের ওজন কমাতে সাহায্য করে। মাসেল টোন করতে সাহায্য করে। এটি ব্লাড প্রেসার ও রক্তের গ্লুকোজ ও সুগারকে নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যান্য ফলের মত আপেল রক্তে চিনির মাত্র বাড়িয়ে দেয় না। ফলে ডাইয়াবেটিসের রোগীরা নিশ্চিন্তে পরিমাণ মতো আপেল খেতে পারেন।

আপেলে প্রচুর পানি থাকায় তৃষ্ণা মেটায় ও শরীর ঠান্ডা করে। জ্বর হলে তা কমাতে সাহায্য করে। তাই জ্বর এর রোগীরা আপেল খেলে ভালো বোধ করে থাকে। আপেলে কোনো লবণ নেই। তাই আপেল থেকে অতিরিক্ত লবণ খাবার কোনো সম্ভাবনা থাকে না।

আপেলে সামান্য ভিটামিন সিও আছে। তাই আপেল রোগ প্রতিরোধেও সাহায্য করে। তাছাড়া ভিটামিন সি তাড়াতাড়ি রোগ সারাতে সাহায্য করে। তাছাড়া আপেলের রস দাঁতের জন্য ও ভালো। কারণ ব্যাকটেরিয়া এর কারণে দাঁতের ক্ষয় হয়। আপেলের রস ৮০% পর্যন্ত দাঁতের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংশ করে দেয়।

সুস্বাদু ফল আপেল খেলে পেটও ভরে বলে হালকা নাস্তা হিসেবে আপেলের জুড়ি মেলা ভাড়। চোখ ধাঁধানো রঙ এর কারণে ছোটরাও বেশ পছন্দ করেই খায় এই ফলটি।

এ কথা প্রমাণিত হয়েছে দিনে একটি আপেল খেলে ডাক্তারের কাছে যেতে হয় না তবে এজন্য ছোকলাসহ আপেল খেতে হবে। ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ পাওয়ার জন্য সব ধরণের ফল ও সবজি ছোলাসহ খাওয়া ‍উচিত বলে আমেরিকার নিউ ইয়র্কে অবস্থিত কর্নেল ইউনিভার্সিটির গবেষকরা জানিয়েছেন।

বাগান থেকে পাড়া তাজা লালচে পাকা আপেল

আপেলে প্রচুর ভিটামিন সি এবং আঁশ আছে। এতে খুব কম ক্যালোরি রয়েছে সেইসাথে কোন চর্বি বা কোলস্টেরল নাই। আপেলকে বলা হয় “অলৌকিক খাবার” এবং “পুষ্টির পাওয়ারহাউজ”।

আপেলে থাকা প্রচুর পরিমাণে পলিফেনল অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হিসেবে কাজ করে আলঝেইমারস ও অ্যাজমার সমস্যাগুলো দূর করে। এছাড়া ওজন কমায় ও হাঁড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখে।

ভারতের হিমাচলপ্রদেশ কাশ্মীর ও পাহাড়ি অঞ্চলে মূলত আপেল চাষ হয় সবচেয়ে বেশি। রয়াল ডেলিশিয়াস, গোল্ডেন, গ্রিমি স্মিথসহ অনেক প্রজাতির আপেল উৎপাদিত হয় অধিক। বাংলাদেশে প্রাকৃতিকভাবে না জন্মালেও প্রায় সারা বছরই আপেল পাওয়া যায়। পাহাড়ী অঞ্চলের জলবায়ু আপেল চাষের জন্য উপযোগী। উর্বর দোআঁশ মাটি এই চাষের জন্য ভালো।

ক্যান্সার প্রতিরোধে দিনে একটি আপেল:

দিনে একটি আপেল সেইসাথে শাক সবজি’তে পূর্ণ খাবার কার্যকরী বলে ক্যান্সার প্রতিরোধী গবেষণায় দেখা গেছে। গবেষণাটি অ্যানুয়াল ফ্রন্টিয়ারস ইন ক্যান্সার প্রিভেনশন রিসার্চ কনফারেন্স ইন সিয়াটলে পেশ করা হয়।

গবেষণাগার ও প্রাণীদের উপর চালানো এক গবেষণায় দেখা যায়, আপেলে থাকা একটি কেমিক্যাল কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে বলে জানায় ফ্রেন্চ ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর হেল্থ এন্ড মেডিক্যাল রিসার্চ এর গবেষণা।

দাঁতের স্বাস্থ্য ভালো রাখে আপেল

দিনে তিন বা তার অধিকবার আলু ছাড়া শাক সবজি নন-হজকিন’স লিমফোমা এর ঝুঁকি ৪০% কমায় বলে জানান মায়ো ক্লিনিক কলেজ অব মেডিসিন এর গবেষকরা। নন-হজকিন’স লিম্ফোমা’র সৃষ্টি হয় যখন লিম্ফ নোডস (ছোট প্রত্যঙ্গ যা ক্ষতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সাহায্য করে) এ কোষগুলো বিভক্ত হয় এবং নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বৃদ্ধি পায়।

“ধারণা করা হচ্ছে আমরা যা খাই তার সাথে এক-তৃতীয়াংশ ক্যান্সার সম্পর্কিত…অনেক ক্যান্সারই প্রতিরোধযোগ্য,” ফলে ও শাক সবজি’তে থাকা অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টস শরীরকে ফ্রি র্যা ডিক্যালসের থেকে বাঁচায়।

আপেল নিয়ে চালানো গবেষণায় দেখা যায়, আপেলে পাওয়া অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টে ক্যান্সার আক্রান্ত কোষগুলো উন্মুক্ত করেন। তারা দেখেন প্রোসাইয়ানিডিনস নামে একটি অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট এক সিরিজ সেল সিগন্যাল ঘটায় যাতে ক্যান্সার আক্রান্ত কোষগুলো মারা যায়।

গবেষণাগারে চালানো এক গবেষণায় ইদুরদের কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার উপাদান দেয়া হয় এরপরে তাদের প্রোসাইয়ানিডিনস মিশ্রিত পানি খাওয়ানো হয়। যেসব ইদুরকে ছয় সপ্তাহ ধরে “আপেল পানি” দেয়া হয়েছিল তাদের কোলনের ক্ষতিগ্রস্ত প্রিক্যান্সারাস কোষের সংখ্যা স্বাভাবিক খাবার দেয়া ইদুরদের তুলনায় অর্ধেকে নেমে যায় ।

তাজা লাল ও সবুজ আপলে খেতে ভালোাসে সব বয়সীরা

এই গবেষণায় দেখা যায় “ছোলাসহ পুরোটা আপেলের হয়তো কিছুটা উপকারিতা (ক্যান্সার প্রতিরোধে) রয়েছে,”। সাইয়ানিডিনস রেড ওয়াইন এবং কোকোয়া’য় প্রচুর পরিমানে পাওয়া যায়।

উপরোক্ত আলোচনার পরে বলা যায় প্রতিদিন একটি করে আপেল খেলে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে না কথাটি আর মিথ্যা নয় বরং সত্যি। তাই বিলম্ব না করে যারা এই গবেষণা নিবন্ধটি পড়লেন তারা আজকে থেকেই একটি করে আপেল খেতে শুরু করেন। এর ফল নিজেই পাবেন।

আরো দেখুন

Leave a Comment