পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত হলো ‘দ্বিতীয় চাঁদ’; বিশ্বজুড়ে তোলপাড়

দ্বিতীয় চাঁদ

আকাশেতে লক্ষ তারা চাঁদ কিন্তু একটাই। যুগের পর যুগ ধরে এই কথাই উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু–পূর্ব মেরু থেকে পশ্চিম মেরুর মানুষরা জেনে আসছেন। চাঁদ নিয়ে মহাকাশ বিজ্ঞানীদের নতুন তথ্যে সেই জানার মধ্যে বাক নিলো। নতুন এক চাঁদ নাকি পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।  

‘পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্বিতীয় চাঁদ’ কথাটি শুনতে অবাক লাগলেও নাসার একটি প্রকল্প থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে চাঁদের পাশাপাশি নতুন করে এক গ্রহাণু বা ‘ছোট চাঁদ’ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ বিষয়ক ইউনিয়নের স্মিথসোনিয়ান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরিতে অবস্থিত মাইনর প্ল্যানেট সেন্টার ২৫ ফেব্রুয়ারি এই ‘ছোট চাঁদ’ খুঁজে পাওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে।

এই নতুন ‘ছোট চাঁদ’ আসলে একটি গ্রহাণু। যার নাম রাখা হয়েছে ‘২০২০ সিডি৩’। এটি আকারে ১.৯ মিটার চওড়া ও ৩.৫ মিটার লম্বা। অর্থাৎ একটি গরু বা জল হস্তীর আকারের হবে গ্রহাণুটি। আর সে কারণেই চাঁদের মতো খালি চোখে দেখা যাবে না নয়া চাঁদকে।

দ্বিতীয় চাঁদের নাম রাখা হয়েছে ‘২০২০ সিডি৩’

আমেরিকার অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ নাসার গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্য কাটালিনা স্কাই সার্ভে পৃথিবীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ গ্রহাণুগুলোর গতিপথ নজরে রাখে।

সংস্থাটির বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি সন্দেহাতীতভাবে অবাক হওয়ার মতো এক ঘটনা। কারণ কয়েক কোটি গ্রহাণুর মধ্য থেকে একমাত্র এই গ্রহাণুটি বর্তমানে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। তবে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করা প্রথম গ্রহাণু নয় ‘২০২০ সিডি৩’।

হইচই পড়ে গেছে বিজ্ঞান মহলে:

এর আগে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে ২০০৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত ‘২০০৬ আরএইচ১২০’ নামের আরেকটি গ্রহাণু পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেছিল। ওই সময়ে বিজ্ঞান অঙ্গণে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছিল।

এরপর তা পুনরায় সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে। এবার ‘২০২০ সিডি৩’ গ্রহাণুটিও পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ শেষে আবারো তার আগের কক্ষপথে ফেরত যাবে, নাকি পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়বে তা হিসেব করে বের করার চেষ্টা করছে মহাকাশ গবেষণায় নিয়োজিত সংস্থা নাসা।

মিনি মুনের খোঁজ পেলেন দুই জ্যোর্তিবিজ্ঞানী:

ক্যাসপার ওয়ের্জকোস ও থিওডোর প্রুনে নাসার বিখ্যাত দুই জ্যোর্তিবিজ্ঞানী। যারা এই মিনি মুনের খোঁজ পান। ২০০৬ সালে এমন বস্তুর ইঙ্গিত পান তারা। পৃথিবীর কক্ষে ঢুকে পড়েছিল মহাজাগতিক ওই বস্তুটি। কয়েক বছর পরে আবার বিদায় জানায় পৃথিবীকে। এর পর নতুন করে আলোচনায় আসলো মিনি মুন বা দ্বিতীয়টি চাঁদটি।

মাইনর প্ল্যানেট সেন্টার এই ‘আর্থ-অবজেক্ট’-এর কথা সামনে আনে

পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে ‘মিনি মুন’:

পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে নতুন সন্ধ্যান পাওয়া চাঁদটি। তবে রূপে-গুনে চাঁদের ধারেকাছে নেই সে। এমনকী আকারেও আসল চাঁদের চেয়ে অনেকটাই ছোট। তাই আপাতত ‘মিনি মুন‘ নামেই তাঁকে অভিহিত করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। স্মিথসন অ্যাস্ট্রোফিডিক্যাল অবজারভেটরির মাইনর প্ল্যানেট সেন্টার এই ‘আর্থ-অবজেক্ট’-এর কথা সামনে আনে।

মাইনর প্ল্যানেট অবজারভেটরির জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেছেন, “এই মহাজাগতিক বস্তুর আকার ছোটখাটো একটা গাড়ির মতো। পৃথিবীর কক্ষপথের সঙ্গে এর কক্ষপথ মিলে গেছে। তাই পৃথিবীকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে রেখেই ঘুরে যাচ্ছে মিনি মুন”।

ঘটনার সূত্রপাত হয় যেভাবে:

মিনি মুনের ঘটনার সূত্রপাত ১৫ ফেব্রুয়ারি-২০২০ সালে। ওইদিন রাতে উজ্জ্বল এক বস্তুকে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসতে দেখে চমকে উঠেছিলেন মহাকাশ গবেষকরা। অবজারভেটরি থেকে মহাশূন্যে চোখ রেখে বসে ছিলেন তারা। তখনই দেখা মেলে নয়া চাঁদের।

যদিও পৃথিবীকে আঘাত করার মতলব তার ছিল না। পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসার পর তাকে জাপটে ধরে। ব‌্যস! তারপর থেকে পৃথিবীর সঙ্গেই আঠার মতো সেঁটে রয়েছে সেই মহাজাগতিক বন্তুটি।

পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসার পর তাকে জাপটে ধরে

পৃথিবীকে ৩ বছর ধরে প্রদক্ষিণ করছে মিনি মুন:  

বিজ্ঞানীরা জানান ১৫ ফেব্রয়ারি-২০২০ সালে নতুন চাঁদ বা মিনি মুনের সন্ধ্যান পেলেও দ্বিতীয় চাঁদটি পৃথিবীকে ৩ বছর ধরে প্রদক্ষিণ করছে। চাঁদের মতোই সে-ও পৃথিবীর চারদিকে ছন্দে পাক খাচ্ছে। শুনতে অবাক লাগলেও, বিজ্ঞনীদের দাবি ঘটনাটি ঘটছে।

গত তিনবছর ধরেই এই ‘ছোট চাঁদ’ পৃথিবীকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করছে। তবে খুঁজে পাওয়া এই উপগ্রহের আকৃতি খুব বড় নয়। একটা গাড়ির মতো। তাই বিজ্ঞানীরা একে ‘ছোট চাঁদ’ হিসেবে ডাকছে।

অ্যারিজোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লুনার অ্যান্ড প্ল্যানেটোরি ল্যাব’র অধীনস্থ ক্যাটালিনা স্কাই সার্ভের বিজ্ঞানীদের ধারাবাহিক গবেষণায় এই ‘ছোট চাঁদের’ অস্তিত্ব ধরা পড়ে। এরপর গবেষণার সঙ্গে যুক্ত প্রধান বিজ্ঞানী ক্যাসপার উইয়ারকোস নিজেই ট্যুইট করে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছেন। একটি ভিডিও ট্যুইট করেন তিনি ।

গত তিনবছর ধরে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে দ্বিতীয় চাঁদটি

গত তিনবছর ধরে এই উপগ্রহটি পৃথিবীর চারিদিক ঘুরছে। তবে এটিকে চাঁদের মতো উপগ্রহ বলা ঠিক নয়। কারণ এটি আদতে একটি গ্রহাণু। যা গত তিনবছর ধরে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে। তবে এটা স্থায়ী নয়।

যে কারণে ‘ছোট চাঁদ’বা মিনি মুন হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে:

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, গ্রহাণু বলয় থেকে ছোট-বড় বিভিন্ন আকৃতির গ্রহাণু পৃথিবীর কাছে আসে। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়নের মাইনর প্ল্যানেট সেন্টার (এমপিসি) পৃথিবীর সংস্পর্শে আসা এরকম গ্রহাণু থেকে গ্রহের উপর নজর রাখা হচ্ছে।।

তাদের তথ্য বলছে, পৃথিবীর চারপাশে থাকা প্রায় ১০ লাখের বেশি গ্রহাণুর মধ্যে এটি দ্বিতীয় ‘ছোট চাঁদ’। এর আগের ২০০৬ আরএইচ১২০ নামের ছোট চাঁদটি ১৮ মাসের জন্য পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছিল।

বিজ্ঞানী দলের আরও এক সদস্য জানিয়েছেন, পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ কি.মি। তবে নয়া আবিষ্কৃত ‘ছোট চাঁদ’ আরও বেশি দূরত্বে রয়েছে। তবে তার দূরত্ব এখনও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তা নির্ধারণ করতে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা।

নয়া আবিষ্কৃত ‘ছোট চাঁদ’কে নিয়ে আরও গবেষণা করা হচ্ছে

এ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের দাবি, এদের আকৃতি এতটাই ছোট হয়, যে দূরত্ব নির্ধারণ করতে কিছুটা সমস্যা হয়। তবে নয়া আবিষ্কৃত ‘ছোট চাঁদ’কে নিয়ে অধিকতর গবেষণা করা হচ্ছে।

নতুন তথ্যে চমকে উঠেছে পৃথিবী:

এতো দিন আমরা জেনে এসেছি ‘এক-এ চন্দ্র, দুই-এ পক্ষ, তিন-এ নেত্র……’ । এতে অবাক হবার কিছু নেই । এবার যদি বলা হয় এক-এ একটা নয় দুই দুটি চন্দ্র ! তাহলে চমকে উঠতেই হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এবার সামনে আসা নতুন তথ্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরা দ্বিতীয় চাঁদটি কৃত্রিম নয়, প্রাকৃতিক চাঁদ। চমকপ্রদ এই তথ্যটি সামনে আসায় চমকে উঠেছে বিশ্ববাসী। মিনিমুন’ ২০২০ সিডি৩ র সন্ধান পাবার পর নাসার জ্যোতির্বিজ্ঞানী মহলেও রীতিমত চমক সৃষ্টি হয়েছে । 

বিজ্ঞানী ক্যাসপার জানিয়েছেন, মিনিমুন আদতে কোনও গ্রহ বা নক্ষত্র নয়, আসলে ধূমকেতু থেকে ছিটকে যাওয়া অংশ । মহাকাশে ঘুরতে ঘুরতে বছর তিনেক আগেই যখন পৃথিবীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন পৃথিবীর টানে পৃথিবীর কক্ষপথে চলে আসে । তবে এটা প্রথম নয়, এর আগেও এই ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে ।

মিনি মুন
পৃথিবীর টানে পৃথিবীর কক্ষপথে চলে আসে মিনি মুন

তবে এই মিনিমুন কতদিন পৃথিবীর সঙ্গে জুড়ে থাকবে সেটাও একটা ভাবনার বিষয়। কারণ এই ধরনের মহাজাগতিক বস্তুরা তো আর স্থায়ী সম্পর্ক তৈরির জন্য আসে না, তারা আসা যাওয়ার মাঝেই থাকে।

‘ছিনতাইকারী’ পৃথিবীর কক্ষপথে ‘ছোট চাঁদ’:

কে বলে কেবলই জমিনে জটিলতা, মহাশূন্যে সহিংসতা নেই? সৃষ্টিলগ্ন থেকেই সহিংস মহাবিশ্ব। বিশেষত মহাকর্ষ বলপূর্বক তুলনামূলক ছোট বস্তুকে বড়রা নিজের কক্ষপথে, বলয়ে টেনে ফেলছে। এটা আকাশগঙ্গা ছায়াপথের বেলায় সত্যি, মিথ্যে নয় সূর্যের বেলায়ও।

মানুষের পৃথিবীও ছিনতাইকারী এক গ্রহ। তারই আরেকটা স্বাক্ষর দিচ্ছে টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশ থেকে পেড়ে আনা একটা খবর : ‘পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরছে একটা ‘ ছোট চাঁদ’। তাও তিন বছর ধরে।

বিভ্রান্ত বড় না করতে এখানেই বলে রাখি, ‘আকাশেতে লক্ষ তারা, চাঁদ কিন্তু একটা।’ এই ‘আকাশে’ মানে পৃথিবীর কক্ষপথে; আর চাঁদ মানে একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ। পৃথিবীর কক্ষপথে মনুষ্যসৃষ্ট কৃত্রিম উপগ্রহের সংখ্যা একটা-দুটা নয়, এখনই সক্রিয় আছে প্রায় এগারোশটা স্যাটেলাইট; নিষ্ক্রিয় আছে আড়াই হাজারের বেশি।

পৃথিবীর চারদিকে ঘুরা দ্বিতীয় চাঁদটি কৃত্রিম নয়, প্রাকৃতিক চাঁদ

‘মায়াজালে বন্দি হইয়া আর কতকাল’থাকবে ২০২০ সিডি৩? সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্রতি ৪৭ দিনে পৃথিবীকে সে এক চক্কর দিচ্ছে। ধীরে ধীরে পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

ধারণা করা হচ্ছে, এপ্রিলেই সে বন্দিদশা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে সক্ষম হবে। এ সময়ের মধ্যে বন্দি গ্রহাণুটি থেকে আমরা কোনো কিছু জানতে, বুঝতে বা শিখতে পারব কি এমন প্রশ্ন দেখা যাচ্ছে মহাকাশ প্রেমীদের কাছে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের নতুন চাঁদের তথ্য বিশ্বব্যাপী যে আলোড়ন তৈরি হয়েছে তাতে কেউ নতুন চাঁদ থাকবে বলে মনে করছেন না। কারণ বিজ্ঞানী এর আগেও এমন তথ্য দেওয়ার পর সেই চাঁদও চলে গেছে। এবার নতুন চাঁদ মামা পৃথিবীতে থাকে কিনা তা দেখার অপেক্ষায় বিশ্ববাসী।

তথ্য সূত্র:

এএফপি, ডেইলি মেইল, দ্য আটলান্টিক, নিউ ইয়র্ক টাইম, ফোবের্স, ফক্স নিউজ, সিএনএন ইন্টারন্যাশনাল, দ্য সান ও হাফিংটন পোস্ট

আরো দেখুন

Leave a Comment