পৃথিবীর নতুন আতঙ্ক পঙ্গপাল; ডেকে আনবে ভয়ঙ্কর মহামারী

কয়েকদিন ধরে বিশ্বজুড়ে বেশ আলোচিত শব্দ করোনাভাইরাস। এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে পঙ্গপালের নাম। ঘাস ফড়িংয়ের সমগোত্রীয় একটি প্রাণী হচ্ছে পঙ্গপাল

পবিত্র কুরআন ও বাইবেলের মতো একাধিক ধর্মগ্রন্থে এসব পতঙ্গের আক্রমণ সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত শাস্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভয়ংকর মহামারী আকারে আর্বিভূত হওয়া ফসলখেকো এক পতঙ্গ পঙ্গপাল নিয়ে এ আয়োজন।

বিশাল বিশাল ঝাঁক বেঁধে পঙ্গপালরা আক্রমণ করে, মাঠের পর মাঠ ফসল উজার করে ফেলে। ১০ লাখ পতঙ্গের একটি ঝাঁক একদিনে ৩৫ হাজার মানুষের খাদ্য খেয়ে ফেলতে পারে।

পৃথিবীর প্রাণী জগতের মধ্যে অত্যান্ত বিস্ময়কর এক আচরণ পঙ্গপালের ঝাঁক। পৃথিবীতে অন্য কোনো প্রাণী পঙ্গপালের মতো এতো বড় দলে এতো দ্রুত নাটকীয়ভাবে আবির্ভুত হয় না।

পঙ্গপাল ও ঘাস ফড়িংয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো- ঘাস ফড়িং একাকি বসবাস করে আর পঙ্গপাল চলে ঝাঁকে ঝাঁকে। একক পঙ্গপালকে ইংরেজিতে বলা হয় Locust আর এদের ঝাঁককে বলা হয় Locust Swarm।

ঘাস ফড়িং একাকি বসবাস করে আর পঙ্গপাল ঝাঁকে ঝাঁকে

একা থাকাকালিন পঙ্গপাল কৃষির জন্য তেমন ক্ষতিকর নয়। তবে বিশেষ বিশেষ কিছু প্রাকৃতিক পরিবেশে পঙ্গপালের আচরণগত বিরাট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় এবং তখন তারা মারাত্মক ক্ষতিকর পতঙ্গে পরিণত হয়।

পঙ্গপালের মস্তিস্কের বিশেষ পরিবর্তনের ফলে তারা অতি দ্রুত বহু সংখ্যক সন্তান জন্ম দান করে এবং ধীরে ধীরে সামান্য থেকে বিশাল দল গড়ে তোলে। পঙ্গপালের সংখ্যা অসম্ভব রুপে বৃদ্ধি পেলে এদের মধ্যে উড়ে বেড়ানোর প্রবৃদ্ধি জাগে।

তখন তারা খাদ্য শস্যের গন্ধ শোকে নতুন নতুন খাবারের সন্ধান বের করে। যতক্ষণ কোনো এলাকার খাদ্য শস্য আছে ততক্ষণ এরা টিকে থাকে।

কোনো একটি এলাকার খাদ্য শস্য শেষ হয়ে গেলে পোকাগুলো নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে অতি দ্রুত ওই এলাকা ত্যাগ করে। পঙ্গপালের উপদ্রপ ঠেকাতে এখন পর্যন্ত কাযকর পদ্ধতি আবিস্কৃত হয়নি।

মাটিতে পঙ্গপালের ডিম দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে এমনকী ২০ বছর পরেও পঙ্গপালের ডিম থেকে বাচ্চা হতে পারে।

আফ্রিকার বিভিন্ন এলাকাজুড়ে উপদ্রব বাড়ছে পঙ্গপালের

বাচ্চা পঙ্গপাল উড়তে পারে না। অল্প বয়সে এ পতঙ্গগুলো লাফিয়ে চলে। সাধারণত একটি বাচ্চা পূর্ণ বয়স্ক হতে প্রায় ৪ সপ্তাহ সময় লাগে।

পূর্ণ বয়স্ক হওয়ার পর তাদের শারীরিক গঠন খুব দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। একটি প্রাপ্ত বয়স্ক পঙ্গপাল প্রতিদিন তার নিজের ওজনের সমান খাদ্য গ্রহণ করে থাকে।

আর পঙ্গপালের একটি ঝাঁক হাজার হাজার টন খাদ্য শস্য খেয়ে ফেলতে পারে এসব পোকা প্রতিনিয়ত দল বেঁধে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।

যাতায়াতের সময় পঙ্গপাল নিজের দেহের শক্তি সঞ্চয় করে বাতাসের উপর ভর করে এগিয়ে চলে। বাতাসের গতিপথ অনুসরণ করে এগিয়ে চলে বলে বাতাস যে দিকে যায় পঙ্গপালও সেদিকেই আক্রমণ করে।

পঙ্গপালের ঝাঁক তাদের যাত্রাপথে মানুষকে আক্রমণ করে না

এক একটি পঙ্গপালের ঝাঁক তাদের যাত্রাপথে কোনো নতুন নতুন ঝাঁকের সাথে মিলিত হয় এবং কয়েকটি বড় বড় ঝাঁক একত্রিত হয়ে আরো অতিকায় ঝাঁক তৈরি করে।

এসব অতিকায় ঝাঁকে কয়েক বিলিয়ন পঙ্গপাল থাকতে পারে। অতিবৃহৎ প্রায় ৬৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে আর প্রতি কিলোমিটারের ঝাঁকে ৪ থেকে ৮ কোটি পতঙ্গ থাকতে পারে।

অতি দ্রুত বহু সংখ্যক সন্তান জন্ম দান করে পঙ্গপাল

এই বিশাল পঙ্গপালের দল তাদের চলার পথে খাবার উপযোগী সকল কিছু সাবাড় করে যায়।

পঙ্গপালের আক্রমণে কোনো অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থায় মারাত্মক ধস নামাতে পারে। এসব পতঙ্গ কোনো অঞ্চলে আক্রমণ করলে সেখানকার কোনো গাছের পাতাও অবশিষ্ট থাকে না।

২০১৯ সালে হর্ণ অব আফ্রিকার দেশগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ শ গুণ বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে ২০১৯ সালের শেষে ও ২০২০ সালের শুরুর দিকে পৃথিবীর একাধিক অঞ্চলে পঙ্গপালের ব্যাপক বংশ বৃদ্ধি ঘটেছে।

এ সময়ের মধ্যে মোসালিয়া ও ইথিওপিয়ার ১২ হাজার হেক্টর ও কেনিয়ার প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট করেছে পঙ্গপাল।

আফ্রিকার বিভিন্ন দেশি ছড়িয়ে পড়ছে পঙ্গপাল

এই পঙ্গপাল সোমালিয়া ও ইথিওপিয়ার মরুভূমিতে উৎপন্ন হয়ে কেনিয়া, জিবুতি, ইরিত্রিয়া ও উগান্ডাসহ এর আশে পাশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।

পঙ্গপাল আক্রান্ত অঞ্চলে হেলিকপ্টার ও বিমান থেকে কীটনাশক ছিটিয়েও এদের দমন করা যাচ্ছে না। এছাড়াও এই একই সময়ে মরুভূমির পঙ্গপাল পাকিস্তানেও আক্রমণ করেছে।

২০১৯ সালের মার্চে পাকিস্তানে প্রথমবারের মতো আক্রমণে সিন্ধু, দক্ষিণ পাঞ্জাব ও খাইবার পাখতোনখোয়া অঞ্চলের প্রায় ৯ লাখ একর জমির ফসল নষ্ট হয়।

সম্প্রতি পাকিস্তানে আক্রমণকারী পঙ্গপাল ভারতেও ঢুকে পড়েছে

সম্প্রতি পাকিস্তানে আক্রমণকারী পঙ্গপাল ভারতেও ঢুকে পড়েছে। কেনিয়া ও পাকিস্তানে ইতো মধ্যে পঙ্গপালের জন্য জরুরী অবস্থা জারি করা হয়েছে।

জাতিসংঘের আশঙ্কা এদের ঠেকাতে না পারলে ২০২০ সালের জুন নাগাদ তাদের সংখ্যা ৫ শ গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।ধারণা করা হচ্ছে আফ্রিকার ৩০ দেশে এই পতঙ্গ ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ ফসলি জমি এই পঙ্গপালে আক্রান্ত হবে। এর ফলে পৃথিবীর ১০ ভাগের এক ভাগ মানুষের বেঁচে থাকার মতো খাবারের অভাব দেখা দিতে পারে।

আরো দেখুন

Leave a Comment