প্রসঙ্গ ধর্ষণ: দায়মুক্তি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ফ্যাক্টর

মোহাম্মদ রবিউল্লাহ: সাম্প্রতিক সময়ের একটি আলোচিত শব্দ্দ ধর্ষণ। উপমহাদেশের তিন দেশ ভারত পাকিস্তান ও বাংলাদেশ একই সময়ে তিন দেশে ধর্ষণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছে। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চল থেকে ধর্ষণের খবর শোনা যাচ্ছে গণমাধ্যম ও সোসিয়াল মাধ্যমে।

নারীদের ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনাগুলোতে অপরাধীদের পরিণতি সর্বদা এক রকম হয় না। রাজনৈতিক পরিচয় বা সমর্থনের বেলায় তার ভিন্নতা দেখা দেয়। রাজনৈতিক সমর্থনযুক্ত অপরাধীরা প্রায়শই অপরাধ করেও দায়মুক্তি পায়।

যা মনে করেন বিশেষজ্ঞরা:

শিক্ষাবিদ, অধিকার কর্মী ও আইনবিদরা মনে করেন, ভুক্তভোগীরা এই ধরনের অপরাধের কথা পুলিশকে জানাতে নিরাপদ বোধ করে না।

ধর্ষণের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক দেশজুড়ে বিক্ষোভের পরে ধর্ষকদের রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ ক্ষমতাগুলো ধরর্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে বলে মনে করেন তারা।

এ প্রসঙ্গে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তাওহিদুল হক বলেন, বর্তমানে দেশব্যাপী কিছু ধর্ষকের মুখোশ উন্মোচন করা সম্ভব হয়েছে তবে এই প্রবণতা চিরকাল অব্যাহত থাকবে না। মিডিয়া ও জনগণ উভয়ই বিষয়গুলো ভুলে যায় এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিবাদ করা বন্ধ করে দেয়। তবে, অপরাধীরা রাজনৈতিক ব্যাকআপ পাওয়া বন্ধ করে না এবং কোনও অপরাধীই রাতারাতি কখনও বেপরোয়া হয়ে ওঠে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এ শিক্ষক বলেন, একজন তরুণ বা যুবক রাজনীতিতে জড়িত হয়ে সে এমন একজন নেতাকে অনুসরণ করে যার ইতিমধ্যে অন্যান্য অনুসারী রয়েছে। সে রাজনৈতিক দলের অংশ হওয়ার সাথে সাথে ব্যক্তি হিসাবে ক্ষমতাবান হয়ে যান। যখন তারা দেখেন যে সমাজের লোকেরা তাদের ভয় পাচ্ছে প্রতিবাদ করার মতো কেউ নেই ওই রাজনৈতিক দলের সদস্যরা বেপরোয়া ও বেআইনী কাজে লিপ্ত হয়ে ওঠে।

ধর্ষকরা জানে যে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে তবে তারা তাতে পাত্তা দেয় না কারণ তারা মনে করে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যাকআপ রয়েছে যা নির্যাতনের শিকার বিচারপ্রার্থী পরিবারের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। অপরাধীরা বিশ্বাস করে তাদের রক্ষার জন্য রাজনৈতিক সমর্থন রয়েছে। তারা তাদের চেয়ে ভাল সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের কাউকে নির্যাতন করে না বলেও তিনি যোগ করেন তিনি।

 নোয়াখালী যেন ধর্ষণের জনপদ:

নোয়াখালীর সাম্প্রতিক ধর্ষণ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে দুস্কৃতিকারীদের রাজনৈতিক নেতাদের সাথে যোগাযোগ রয়েছে ও তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে বলে জনগণ তাদের ভয় পায়।

গণধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া এক নারীকে এক বছরের মধ্যে কমপক্ষে তিনবার ধর্ষণ করেছিল একই ব্যক্তিরা। যারা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় সদস্য। বেঁচে যাওয়া ওই নারীকে পিস্তল দেখিয়ে হুমকি দেয়া হয়েছিল। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ওই ভিকটিমের পাশে দাঁড়ায়নি এবং শেষ পর্যন্ত জীবন রক্ষার ভয়ে ওই নারীকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল।

ওই নারীকে ধর্ষণ করে পাঁচ জন পুরুষ। সেই ধর্ষণের ভিডিও ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পরে নেটিজেনদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। তারপরেই তিনি মামলা দায়ের করেন ও ধর্ষণকারীদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ অভিযান চালায়। শেষতক ধর্ষণকারীদের গ্রেফতার করে পুলিশ।

এর আগে ও পরে ও নোয়াখালীতে আরো নানান জায়গায় ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটেছে।

ওই ঘটনার কয়েকদিন আগে আরো একজন নারীকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী সিলেটের এমসি কলেজে ধর্ষণ করেছিলেন। ধর্ষণের ওই ঘটনাটি ঘটে তার স্বামীর সামনেই।

স্থানীয়রা জানিয়েছে এ ধরনের আরো অনেক ঘটনার সাথে এই চক্রটি জড়িত ছিল তবে তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস পায়নি।

নাগরিক অধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র’র (এএসকে) তথ্য অনুসারে, গত ৯ মাসে গোটা দেশে কমপক্ষে ৯৭৫ জন নারীকে ধর্ষণ করা হয়। যার মধ্যে ২০৮ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছিল। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৩ জন নারীকে গণধর্ষণ করা হয়।

দুর্বৃত্তরা কেন রাজনৈতিক সমর্থন পায়?

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নেতা-কর্মীরা একে অপরের সাথে একটি অস্বাস্থ্যকর সম্পর্কে জড়িত হচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক মুহাম্মদ বদরুল হাসান বলেন, স্থানীয় রাজনীতিতে নেতা ও তাদের অধীনস্থদের মধ্যে পৃষ্ঠপোষক-ক্লায়েন্ট সম্পর্ক বিদ্যমান।

উদাহরণস্বরূপ, যখন কর্মীরা ছোট অপরাধ করে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয় তখন নেতারা তাদের উদ্ধার করতে আসে। নেতারা তাদের ‘সুরক্ষা’নিশ্চিত করেন। বিনিময়ে দুর্বৃত্তরা নেতার প্রতিটি আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে নেতার পক্ষে কাজ করেন। এটি ক্ষমতার রাজনীতির অংশ বলেও জানান তিনি।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বদরুল হাসান মনে করেন, ‘‘ যারা এ ধরনের জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িত রাজনৈতিক নেতারা তাদের অনুগামীদের পাশে দাঁড়িয়ে ধর্ষণকে বৈধতা দেওয়া উচিত নয়। কারণ এটি ন্যায়বিচার প্রার্থীদের সর্বনাশ ডেকে আনে।’’

পৃষ্ঠপোষক-ক্লায়েন্ট সম্পর্ক এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে সাধারণ ব্যাপার। যার অনুশীল শুরু হয়েছে ৮০ এর দশকে। স্থানীয় ও জাতীয় এর পাশাপাশি পেশাদার কল্যাণ সংস্থায় এখন রাজনীতির প্রতিটি স্তরেই এটি ব্যবহার করা হয়েছে। এমন অনুশীলন দায়মুক্তির সংস্কৃতি বিকাশে সহায়তা করছে।

অপরাধীদের রাজনৈতিক ছত্রছায়া:

অপরাধীদের মধ্যে একটি মারাত্মক ধারণা তৈরি হয়েছে যে তারা যদি রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকে তাহলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা তাদের কিছুই করবে না। তাই তারা নিয়মিত ছোট থেকে বড় ধরনের অপরাধের সাথে জড়িত হচ্ছে। ধর্ষণ ও শেষ পর্যন্ত হত্যার মতো অপরাধও দেদারসে করে চলেছে।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনবিদ ড. শাহদীন মালিক বলেন, তারা জানে যে (রাজনৈতিক দলের) আশ্রয় ছাড়া অপরাধ করা সম্ভব নয় এবং তারা রাজনৈতিক দলের পরামর্শদাতা ছাড়া অন্য কোনও বিষয় নিয়ে চিন্তা করে না। আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, সাম্প্রতিক কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনার সাথে রাজনৈতিক পরিচয়যুক্ত অপরাধীরা জড়িত ছিল, যা তাদের প্রথম অপরাধ ছিল না। এটি তাদের ধারাবাহিক কাজের অংশ ছিল। ‘’

একই প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিচালক জোনা গোস্বামী বলেন, ক্ষমতাবান দুর্বৃত্তরা ধর্ষণ ও নির্যাতনকে নারীদের বিরুদ্ধে পেশী শক্তি প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে। যে দলই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তারা কিছু অযৌক্তিক লোককে আশ্রয় দেয়।

বাধা অতিক্রম করতে হয় ভিকটিমদের:

এমনকি যখন ভুক্তভোগীরা ধর্ষণকারীদের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি করতে যায় তখনো তাদের বাধা অতিক্রম করতে হয়। আইন প্রয়োগকারীরা সাধারণত তাদের মোকাবেলা করতে চায় না। দীর্ঘায়িত বিচার প্রক্রিয়া ও বিচারের তথ্য প্রমাণ হাজিরের অভাব অপরাধীদেরও দায়মুক্তি দেয় বলেও যোগ করেন তিনি

দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম করে ধর্ষণের মামলা নিষ্পত্তি হতে পাঁচ থেকে দশ বছর সময় লাগে। যখন অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় থাকে তখন ভুক্তভোগীরা সেই দীর্ঘ লড়াইটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে না।

ভিকটিম তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে গিয়ে সমাজে হুমকি ও নিরাপত্তাহীন বোধ করে। বছরে পর বছর ধরে কেউ তার পাশে থাকে না। এমন অনেক মামলা দেখা গেছে যা শেষ পর্যন্ত আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি হয়েছে বলেও তিনি জানান।

তবে আশার কথা হলো ইতিমধ্যে সরকার জনসমর্থন বিবেচনায় নিয়ে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড আইন করেছে।তবে আইন বাস্তবায়ন নিয়ে অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।যদি আইন বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে ধর্ষণের মতো অপরাধ অনেকটা কমবে বলেও মনে করেন সরকারের অনেক মন্ত্রী।

তথ্যসূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন ও যমুনা টেলিভিশন

আরো দেখুন

Leave a Comment