যুদ্ধের ইতি টানলেন ট্রাম্প; শান্তিপ্রিয় আফগানদের ভাগ্যে কী জুটবে?

আমেরিকা তালেবান চুক্তি

দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটছে যাচ্ছে আফগানিস্তান। দেশটি থেকে মার্কিন ও ন্যাটো সেনা প্রত্যাহার ও আঞ্চলিক শান্তি ফিরিয়ে আনতে ২৯ ফেব্রয়ারি-২০২০ কাতারের রাজধানী দোহায়  একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ও তালেবান নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

তালেবান প্রতিনিধি দলের নেতা মোল্লা আব্দুল গনি বরদার ও আফগানিস্তানে আমেরিকার দূত জালমে খলিলজাদ দোহায় নিজ নিজ পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর মধ্য দিয়ে দেড় যুগেরও বেশি সময়ে চলা আফগান যুদ্ধের অবসানে চুক্তিতে স্বাক্ষর করলো আমেরিকা ও তালেবান।

চুক্তি সই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন মাইক পম্পেও। এছাড়া মাকিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তি সইয়ের আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তালেবান প্রতিনিধি দলের সদস্যরাও। কাতারের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ বছর ধরে চলা আফগান যুদ্ধের অবসানে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, তালেবান শর্ত মেনে চললে আগামী ১৪ মাসের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সব সৈন্য প্রত্যাহার করবে আমেরিকা ও তার ন্যাটো মিত্ররা।

এখন থেকে আফগানিস্তানে আর কোনো হামলা চালাবে না তালেবান। তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে জঙ্গি গোষ্ঠী আল-কায়েদাকে কোনো তৎপরতা চালাতে না দেওয়ারও অঙ্গীকার করেছে তারা। এখন আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দেশটির সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে তালেবান।

চুক্তি মানতে নারাজ আশনাফ ঘানি:

আমেরিকা ও আফগান বিদ্রোহীগোষ্ঠী তালেবানের মধধ্যে ঐতিহাসিক চুক্তির একটি অংশ মানতে চাচ্ছেন না আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি।

চুক্তিতে আফগান সরকারের হাতে পাঁচ হাজারের বেশি তালেবান বন্দির মুক্তির বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে। তবে চুক্তির এই অংশটি মানতে নারাজ আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি। আমেরিকা ও তালেবান চুক্তির একদিন পর ১ মার্চ-২০২০ এক সংবাদ সম্মেলনে তালেবান বন্দি মুক্তির বিষয়ে আপত্তি জানান আশরাফ ঘানি।

আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশনাফ ঘানি

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কথার পাশাপাশি চুক্তিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানরা যৌথভাবে আফগানিস্তানে অন্তত ৫ হাজার তালেবান সদস্য ও রাজনৈতিক নেতাদের বন্দিদশা থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করবে।

তবে আশরাফ ঘানি বলছেন, ‘আফগান সরকার ও সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ৫ হাজার তালেবানের বন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি দেয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া এ বিষয়ে সরকার কোনো প্রতিশ্রুতিও দেয়নি।’

আফগানিস্তানে কাকে বন্দিদশা থেকে মুক্তি দেয়া হবে, সে ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো এখতিয়ার রাখে না। তাই চুক্তিতে এ বিষয়ে দুই পক্ষ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা মেনে নিতে পারবে না আফগান সরকার।

সেনা প্রত্যাহার শুরু করেছেন ট্রাম্প:

এদিকে চুক্তির একদিন পরই আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। খোদ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী, ১৩৫ দিনের মধ্যে আফগানিস্তানে থাকা ১৩ হাজার মার্কিন সেনার মধ্যে ৮ হাজার ৬০০ সেনা প্রত্যাহার করে নেবে যুক্তরাষ্ট্র।

আল-কায়েদা ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে আমেরিকার টুইন টাওয়ারে হামলা চালানোর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আফগানিস্তানে তৎকালীন তালেবান সরকারকে উৎখাতে আগ্রাসন চালায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট। এরপর থেকেই সেখানে মার্কিন সেনা মোতায়েন রেখেছে দেশটি।

বের করা যায়নি হতাহতের সঠিক পরিসংখ্যান:

১৮ বছরের এই যুদ্ধের কত সংখ্যক আফগান বেসামরিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও তালেবান সদস্যের প্রাণ গেছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান বের করাটা কঠিন।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই যুদ্ধে ৩২ হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

আর যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ডের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইনস্টিটিউট জানায়, আফগানিস্তানে যুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর ৫৮ হাজার সদস্য ও বিরোধী পক্ষের ৪২ হাজার যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। 

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে আফগানিস্তান থেকে ফেরত যাচ্ছেন মাকির্ন সেনারা

অপরদিকে আফগানিস্তানে অভিযানের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক যৌথ বাহিনীর প্রায় সাড়ে তিন হাজার সৈন্য নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে দুই হাজার ৪০০ এর বেশি যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য বলে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

তাদের তথ্য অনুযায়ী, ১২ হাজারের মতো বিদেশি সৈন্য এখনও আফগানিস্তানে রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধের ইতি টানার ঘোষণার পর তা কাযকর করলেন।

আফগান যুদ্ধে আমেরিকার কত খরচ হয়েছে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়ই বলেন যে, দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধ শেষ করে মার্কিন সেনাদের ঘরে ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী তিনি। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে সহিংসতা বন্ধের ঘোষণা দেন। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে আমেরিকার শীর্ষ নেতারা ২০ সপ্তাহের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে ৫ হাজার ৪০০ সেনা সরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি একটি পরিসংখ্যানে দেখিয়েছে যে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত আফগানিস্তানে কী পরিমাণ ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১১ সাল থেকেই শান্তি চুক্তিতে আসার ব্যাপারে দোহায় বৈঠক করে আসছেন তালেবান নেতারা। ২০১৩ সালে দোহায় তালেবানের একটি কার্যালয়ও খোলা হয় তবে পরে তা বন্ধ হয়ে যায়।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে তালেবান নেতারা ঘোষণা দেন, শান্তি আনার লক্ষ্যে আমেরিকার নেতাদের সাথে বৈঠকে বসবেন তারা। তবে শুরু থেকেই আফগান সরকারের সঙ্গে বৈঠকে বসতে অনীহা জানিয়ে আসছিলেন তালেবান নেতারা। আফগান সরকারকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের হাতের পুতুল’অভিহিত করে তালেবান নেতারা আফগান সরকারের সাথে আলোচনা থেকে দূরে থাকেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের হিসাব মতে, ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক ব্যয় হয়েছে ৭৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

হিসাব বলছে, ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে দেশটিতে এক লাখ মার্কিন সেনা ছিল, যার কারণে বছরে যুদ্ধের ব্যয় ১০০ বিলিয়ন ডলার বেড়ে দাঁড়ায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সৈন্যদের সরাসরি সামরিক অভিযান থেকে সরিয়ে আফগান বাহিনীকে প্রশিক্ষণে বেশি মনোনিবেশ করার পর ব্যয় বেশ কমে আসে।

২০১৬ থেকে ২০১৮ সালে বার্ষিক ব্যয় নেমে দাঁড়ায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিসাবে জানা যায়, এ বছর ব্যয় হয়েছে ৩৮ বিলিয়ন ডলার।

এছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি ও অন্য সরকারি সংস্থাগুলোর সাথে মিলে ৪৪ বিলিয়ন ডলার বিভিন্ন ধরণের পুননির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় করেছে। সরকারি তথ্যানুযায়ী, সব মিলিয়ে ২০০১ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৮২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হয়েছে।

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কষ্ট অব ওয়্যার বা যুদ্ধ প্রকল্পের ব্যয় প্রজেক্ট নামে এক স্বতন্ত্র গবেষণায় এ যুদ্ধের ব্যয়ের বিষয়ে বলা হয়েছে, আফগান যুদ্ধে খরচের সরকারি যে হিসেব দেখানো হয়েছে তাতে বাস্তব হিসেবের চেয়ে অনেক কম দেখানো হয়েছে।

সেখানে বলা হয়, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের জন্য কংগ্রেস এক ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ তহবিল অনুমোদন করে।

এই ব্যয়ের মধ্যে যুদ্ধ ফেরত সেনাদের জন্য করা খরচ, যুদ্ধ সম্পর্কিত কর্মকাণ্ডে সরকারের বিভিন্ন বিভাগে যে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে ও সংঘর্ষে অর্থায়নের জন্য নেয়া ঋণের সুদকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সব কিছু যোগ করা হলে খরচ অন্তত দুই ট্রিলিয়ন ডলার হবে।

কাতারের মধ্যস্ততায় চুক্তিটি করা হয়

কাতারের দোহায় নয় দফা আলাপ-আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র-তালেবান একটি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বিশ সপ্তাহের মধ্যে ৫৪০০ সেনা সরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান আলোচক।

কিন্তু কয়েকদিন পরে তালেবানের হামলায় একজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর আলোচনাকে ‘মৃত’ বলে ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পর্দার আড়ালে উভয় পক্ষ আবার আলোচনা শুরু করে।

এক সপ্তাহ আগে সহিংসতা কমানোর ব্যাপারে সম্মত হয় তালেবান-যদিও আফগান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, এই সময়ের মধ্যেই তাদের হামলায় ২২ জন সৈনিক ও ১৪ জন বেসামরিক বাসিন্দা নিহত হয়েছে।

চুক্তির পর এবার কী করবে তালেবান?

বিবিসির আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক সেচুন্দর কারমানির এক নিবন্ধে ওঠে এসেছে আমেরিকার সাথে চুক্তি ও তালেবানের বিষয়ের পরবর্তী পদেক্ষেপের কথা। যা দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর হলো। কয়েক দফা আলোচনার পর অবশেষে দোহায় চুক্তিটি সম্পন্ন হলো।

মার্কিন, আফগান ও তালেবান কর্মকর্তাদের সকলেই খুব সতর্কভাবে কাতারের দোহায় স্বাক্ষরিত চুক্তিকে ‘শান্তি চুক্তি’বলা থেকে বিরত থেকেছেন। তবে তারপরও আফগানিস্তানে বিরাজ করছে কিছুটা আশা। আংশিক অস্ত্রবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এক সপ্তাহ ধরে দেশে সহিংসতার মাত্রা কমেছে।

বেশ কয়েক বছর ধরেই আফগান যুদ্ধ এক অচলায়তনে আবদ্ধ ছিল। তালেবান দেশের অভ্যন্তরে ক্রমেই নতুন নতুন অঞ্চলের দখল নিচ্ছিল বা সরকারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছিল।

তবে বড় বড় শহর কিছুতেই দখল নিতে পারছিল না তালেবান। এই অচলাবস্থার ফলে হয়তো উভয় পক্ষের মধ্যে কিছুটা বোধোদয় দেখা দিয়েছে। তালেবান ও মার্কিন উভয় নেতৃত্বই বুঝতে পেরেছে যে, কোনো পক্ষই শতভাগ সামরিক বিজয় অর্জন করতে পারবে না।

আফগানিস্তানে তালেবান ও মার্কিন সেনাদের সরব উপস্থিতি

তাছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তো দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছিলেন যে, আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারে তার সিদ্ধান্ত অটল রয়েছে।

আমেরিকা বড় ধরনের ছাড় দিতে রাজি হওয়ার কারণেই উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল, তালেবানকে আগে আফগান সরকারের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

তবে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো আফগান সরকারকে বৈধতা দিতে নারাজ। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো এই অবস্থান পরিবর্তন করতে সম্মত হয়। রাজি হয় তালেবানের সঙ্গে সরাসরি দর কষাকষিতে।

তালেবানের প্রধানতম দাবি ছিল আফগানিস্তানে বিদেশী সেনাদের উপস্থিতি প্রত্যাহার করতে হবে। এই দাবি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি তালেবানের সঙ্গে আলাপে সম্মত হয়। এই আলোচনা থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতামূলক চুক্তি স্বাক্ষর সম্ভব হয়েছে।

তালেবানও যুক্তরাষ্ট্রের মূল দাবিতে ছাড় দিয়েছে। সংগঠনটি রাজি হয়েছে যে, আল কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে তারা। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান হামলার প্রধান কারণই ছিল মূলত তালেবান ও আল কায়েদার মধ্যকার সম্পর্ক।

যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে চুক্তি হওয়ার কারণে তালেবানের সঙ্গে আফগান সরকার ও অন্যান্য স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোর আলোচনার দ্বারও খুলেছে তবে এই আলোচনাগুলো হবে আরও অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। তালেবান আফগানিস্তানকে ‘ইসলামিক আমিরাত’বানাতে চায়।

নারীর অধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে তালেবানের অবস্থান:

২০০১ সালের পর থেকে সৃষ্টি হয়েছে গণতান্ত্রিক আধুনিক এক আফগানিস্তানের। দুই পক্ষকে এই দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনতে হবে। নারীর অধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে তালেবানের অবস্থান সংক্রান্ত প্রশ্নগুলোরই সমাধান হতে হবে ‘আন্তঃআফগান’আলোচনার মাধ্যমে।

এ পর্যন্ত এসব প্রশ্নে তালেবান এক ধরণের অস্পষ্টতা জিইয়ে রেখেছে। হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবেই। আলোচনা শুরুর আগে এগুলোই সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা। তালেবান চায় আলোচনার আগে তাদের ৫ হাজার বন্দিকে মুক্তি দিতে হবে।

তবে আফগান সরকার এই বন্দিদেরকে এত আগেই ছাড়তে রাজি নয়। তালেবানকে নমনীয় করতে দর কষাকষিতে এই বন্দিদের কাজে লাগাতে চায় সরকার।

ওদিকে তালেবান ছাড়াও, খোদ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যেও আছে দ্বন্দ্ব। আশরাফ গনি প্রেসিডেন্ট। কিন্তু তার প্রতিদ্বন্দ্বী আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ বলছেন গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতারণা করে গনি জিতেছেন।

রাজনৈতিক এই অস্থিতিশীলতার কারণে, তালেবানের বিপরীতে আলোচনার টেবিলে যে অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক শক্তিকে দেখতে চায় আন্তর্জাতিক আংশীদাররা, সেটি আরও কঠিন হয়ে গেল।

একজন আফগান কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, আন্তঃআফগান আলোচনাও লেগে যেতে পারে বছরের পর বছর তবে আমেরিকা ইঙ্গিত দিয়েছে, তালেবান যদি চুক্তি রক্ষা করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ১৪ মাসের মধ্যে তাদের সকল সৈন্য প্রত্যাহার করবে। তার মানে কি সমাধান না হলে আমেরিকা ১৪ মাস পরও সৈন্য রেখে দেবে? এই প্রশ্নের কোনো জবাব এ মুহূর্তে নেই।

এভাবে অস্ত্র হাতে বিভিন্ন অঞ্চল দখলে নেন তালেবানরা

আফগান কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, মার্কিন সেনা প্রত্যাহার হলো ‘শর্তযুক্ত’প্রতিশ্রুতি তবে আরেক কূটনীতিক বলছেন, সেনা প্রত্যাহার হলো অভ্যন্তরীণ আলোচনা শুরুর পূর্বশর্ত, শেষের শর্ত নয়। তার উদ্বেগ হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি সেনা প্রত্যাহার করে ফেলে, আর তালেবান তখন আগ্রাসী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন আফগান সরকারি বাহিনী খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়বে।

অন্যান্য বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, তালেবানের মধ্যে তেমন ছাড় দেওয়ার মনোভাব দেখা যাচ্ছে না। তারা আমেরিকার সঙ্গে হওয়া চুক্তিকে নিজ সমর্থকদের কাছে ‘বিজয়’হিসেবে উপস্থাপন করছে।

 তালেবানের আন্তর্জাতিক বৈধতা ও স্বীকৃতির দীর্ঘ দিনের যে দাবি ছিল তা দোহায় চুক্তি সম্পাদনা অনুষ্ঠানের আড়ম্বড়তা তাদেরকে তা দিয়েছেও। ফলে তারা হয়তো এই অনুসিদ্ধান্তে আসতে পারে যে, উদ্দেশ্য পূরণের জন্য আলোচনাই হলো সবচেয়ে উত্তম পথ।

এদিকে সাধারণ আফগানদের কাছে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হচ্ছে সহিংসতা হ্রাস বা অবসান, অন্তত কম  সময়ের জন্য হলেও। তাদের আশা কি পূরণ হবে? জানা যাবে আসছে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে। আর কয়েক দিন পরেই শুরু হচ্ছে উষ্ণতর বসন্ত ঋতু। আর তখনই সাধারণত ‘লড়াইয়ের মৌসুম’শুরু হয়। শিগগির দেখা যাবে এই মৌসুমে তার ব্যত্যয় ঘটে কিনা।

সাম্রাজ্যবাদীদের গোরস্থান:

ইতিহাসবিদরা আফগানিস্তানের নাম দিয়েছেন ‘সাম্রাজ্যবাদীদের কবরস্তান’। গত দেড়শ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আফগানিস্তানের মাটিতে পরাজিত হয়েছে তিন তিনটি পরাশক্তি। সেই তালিকার প্রথমে রয়েছে উপনিবেশিক ব্রিটিশ শক্তি, এরপর সোভিয়েত ইউনিয়ন আর সর্বশেষ মহাশক্তিশালী আমেরিকা।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আত্মঘাতী বিমান হামলায় নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর এর দায় পড়েছিল আফগানিস্তানে তালেবানদের আশ্রয়ে থাকা ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়েদা জঙ্গি গোষ্ঠীর ওপর।

সেসময় তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লু বুশ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সদর্পে বলেছিলেন, ‘যারা আমেরিকার সাথে থাকবে না তারাই আমেরিকার শত্রু।’ অর্থাৎ, যেসব রাষ্ট্র আফগানিস্তানে তালেবানদের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধে অংশ নেবে না তাদেরকেই আমেরিকার শত্রু হিসেবে গণ্য করা হবে!

এরপর মহাপ্রস্তুতি নিয়ে দারিদ্রপীড়িত আফগানিস্তানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পরাশক্তি আমেরিকা ও এর মিত্র রাষ্ট্রগুলো। সারাবিশ্বের শান্তি প্রিয় মানুষের প্রতিবাদকে ‘বৃদ্ধাঙ্গুলি’দেখিয়ে পশ্চিমের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো তালেবান ধ্বংসের নামে বোমা ফেলতে শুরু করে গ্রামে-গঞ্জে-শহরে।

জানাজা নামাজ ও বিয়ের অনুষ্ঠানের মতো ধর্মীয় ও সামাজিক জমায়েতেও মার্কিন ও মিত্রশক্তিদের অনবরত বোমা বিস্ফোরণ চলতে থাকে, উদ্দেশ্য একটাই তালেবান ধ্বংস।

২০০১ সালের ডিসেম্বরেই পশ্চিমের পরাশক্তিগুলো রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মাধ্যমে কান্দাহারে তালেবান সরকারের পতন ঘটায়। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবানরা আফগানিস্তানে ‘ধর্মীয় অনুশাসনের’ নামে যে অরাজকতা শুরু করেছিল, তা সারাবিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল।

রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে তালেবানদের পতনের পর আফগানদের জীবন যাপনে বদল এসেছে বলে প্রচারণা চালিয়েছিল পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো। বাস্তবে ক্ষমতায় না থাকলেও আফগানিস্তানে তালিবানদের প্রভাব অব্যাহতই ছিল। তাদের নিয়ম অনুযায়ীই চলেছে আফগানিস্তানের অধিকাংশ এলাকা।

মিত্রশক্তির নতুন নতুন ধ্বংসাত্মক বোমা ও অস্ত্রের আঘাতে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়লেও, তারা গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে থেকে যায় দেশটির রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে। পরাক্রমশালী আমেরিকার বিশাল শক্তির মুখে তালেবানরা তাদের সীমিত শক্তি নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরো আফগানিস্তানে।

দেশটিতে থাকা আমেরিকাসহ সব বিদেশি সৈন্যের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী হামলা চালাতে থাকে তালেবান ও তাদের সমর্থিত রাজনৈতিক ও ধর্মীয়গোষ্ঠীগুলো। এভাবেই কেটে যায় একে একে ১৮ বছর।

যুদ্ধ শুরুর আগে আমেরিকাসহ গোটা বিশ্বে প্রতিবাদের ঝড় ওঠেছিল। ওই সময় শান্তিকামীরা বলেছিলেন, যুদ্ধ করে তালেবানদের ধ্বংস করা সম্ভব না। তৎকালিন সংবাদ বিশ্লেষণে ওঠে এসেছিল আফগানিস্তানের মাটিতে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পরাজয়ের নানা চিত্র।

সেসব কথায় কান দেয়নি মার্কিন প্রশাসন। তারা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ শুরু ও তা তালেবানদের ধ্বংস না করা পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই যুদ্ধে ডেকে আনে ইউরোপের মিত্রশক্তিগুলোকেও।

গত ১৮ বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তালেবানদের ধ্বংস করা তো দূরে থাক তাদের কাছে ‘নতি স্বীকার’ করতে বাধ্য হয়েছে। তালেবান নেতাদের কাছে ডেকে মার্কিন প্রশাসন খুঁজে নিয়েছে আফগানিস্তান ছাড়ার পথ। ‘শান্তি’র পথেই যদি আামেরিকা হাঁটতে চায় তাহলে কেন ১৮ বছর যুদ্ধ চালিয়ে ধ্বংস করা হলো একটি দেশ বা একটি দেশের জনজীবন? এমন প্রশ্ন আসা খুবই সাধারণ ব্যাপার।

শান্তি চুক্তি, আত্মসমর্পন, না পালানোর পথ?:

তালেবানদের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডম’ নামে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র আমেরিকা তা তাদেরকে চালিয়ে যেতে হয়েছে সুদীর্ঘ ১৮ বছর। যুদ্ধ চালিয়ে নিতে ২০১৯ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে ৯৭৫ বিলিয়ন ডলার।

জরিপ সংস্থা স্ট্যাটিস্টার তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তান যুদ্ধে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মার্কিন সামরিক বাহিনীর ২ হাজার ৪৪১, যুক্তরাজ্যের ৪৪৫ অন্য মিত্রদেশগুলোর ১ হাজার ১৪৪ জন নিহত হয়েছেন।

ঠিক কতজন আফগান এই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন তা সঠিকভাবে পাওয়া যায়নি। ২০০৯ সালে কাজ শুরু করা জাতিসংঘের অ্যাসিস্টেন্স মিশনের তথ্যানুযায়ী, ২০০৯-২০১৯ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে ১ লাখের বেশি মানুষ হতাহত হয়েছেন।

২২ ফেব্রুয়ারি-২০২০ জাতিসংঘ জানায়, আফগান যুদ্ধে শুধুমাত্র ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৪০০ র বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ৭ হাজারের মতো মানুষ।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াটসন ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, আফগান যুদ্ধে ২০০১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত নিহত হয়েছেন অন্তত এক লাখ ৫৭ হাজার জন। তাদের মধ্যে ৪৩ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ।

বিপুল অর্থ ব্যয় ও রক্তপাতের পরও আফগানিস্তানের অধিকাংশ অঞ্চল এখনো তালেবানদের নিয়ন্ত্রণে রয়ে গেছে। আমেরিকা বা দখলদারদের জন্যে দেশটি পরিণত হয়েছে এক মৃত্যুপুরীতে।

এমনতাবস্থায়, আফগানিস্তানে তালেবানদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জয়ের কোনো আভাস দেখা যাচ্ছে না। তাই এই পরাশক্তির প্রয়োজন হয়েছে আফগানিস্তান ছাড়ার ‘সম্মানজনক’সুযোগ।

রিচার্ড রিক্সনের পথে হাঁটছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প:

১৯৭৩ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন শান্তি চুক্তির মাধ্যমে ভিয়েতনাম থেকে মার্কিন দখলদার বাহিনীর সরে আসার ব্যবস্থা করেছিলেন।

সেই প্রসঙ্গ তুলে ধরে মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের সংবাদ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে রিচার্ড নিক্সনের যেমন প্রয়োজন হয়েছিল ভিয়েতনামে আমেরিকানদের পরাজয় ‘ঠেকানো’ তেমনি নির্বাচনের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রয়োজন হয়েছে আফগানিস্তান থেকে ‘ সম্মান নিয়ে বেরিয়ে পড়া’।

আমেরিকা আফগানিস্তানে যে যুদ্ধে জড়িয়েছে তার কোনো অন্ত নেই— এমন মন্তব্য করেছেন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই ‘শেষ নেই’ যুদ্ধের ইতি টানতে বা আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সৈন্য সরিয়ে নিতে তালেবানদের সাথে দোহায় শান্তি চুক্তিটি করেছে আমেরিকা।

এমন চুক্তিকে তালেবানদের কাছে আমেরিকার ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন একাধিক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক।

মার্কিন প্রশাসন তালেবানদের সঙ্গে সম্পাদিত শান্তি চুক্তি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও এ নিয়ে আফগানদের মধ্যে দেখা গেছে হতাশা ও আক্ষেপ।

চুক্তি অনুসারে আমেরিকা ধীরে ধীরে সব সৈন্য ফিরিয়ে নিবে আফগানিস্তান থেকে। কিন্তু, গত ১৮ বছরে এই দেশটিতে যে অপরিসীম ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে তার কী হিসাব হবে?

সেখানে এতো হত্যার দায় কে নেবেন? আফগানিস্তানকে কি আমেরিকা রেখে যাচ্ছে ধর্মান্ধ তালেবান গোষ্ঠীর হাতে? তাই যদি হয়, তাহলে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির শান্তিপ্রিয় মানুষের ভাগ্যে কী জুটবে? এমন হাজারো প্রশ্ন উঠে আসছে গোটা বিশ্বের গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের বিশ্লেষণে।

তথ্য সূত্র:

বিবিসি, নিউ ইয়র্ক টাইম, রয়টার্স, ইউএসএআইডি, স্ট্যাটিসটিকা ও ওয়াটসন ইনস্টিটিউট

আরো দেখুন

Leave a Comment