টম অ্যান্ড জেরির খুঁনসুটির ৮০ বছর

টম অ্যান্ড জেরির খুঁনসুটির ৮০ বছর

‘টম অ্যান্ড জেরি’। কার্টুন জগতের অনন্য দুই চরিত্র নিয়ে ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৪০ সালে যাত্রা শুরু হয় ‘টম অ্যান্ড জেরি।’ আশি বছর আগে শুরু হওয়া টম আর জেরির লড়াই এখনো চলছে।

উইলিয়াম হ্যানা, জোসেফ বারবারা ও রুডলফআইসিং এর পরিচালক। সংগীত পরিচালক ছিলেন স্কট ব্র্যাডলি। টমের মানুষের মতো চিৎকারে হ্যানা নিজেই কণ্ঠ দিতেন।

চিরকালই বিড়াল ইঁদুরের জম। তবে ইঁদুরও যে বিড়ালকে নাজেহাল করতে পারে তা টম আর জেরির আবির্ভাব না হলে জানা যেত না।

সারাক্ষণ একজন আরেকজনের পেছনে লেগে থাকে, আবার বেশিক্ষণ আলাদাও থাকতে পারে না! এমনি এক মধুর সম্পর্ক এই দুই প্রাণীর।

তাদের খুঁনসুটি কখনো কখনো সহিংসতায়  রুপ নেয় তবে কার্টুনের জগতে কেউ মরে না। হাতুরির আঘাতে চিড়ে চ্যাপটা হয়ে যাওয়া টম দিব্যি বেঁচে উঠে আবার জেরিকে তাড়া করে। এখানে মৃত্যুও হয়ে ওঠে হাসির খোরাক!

হলিউডের মেট্রো গোল্ডউইন মেয়ার (এমজিএম) স্টুডিওর নির্মাণ ও বর্তমানে হ্যানা বারবারা স্টুডিওতে নির্মিত জনপ্রিয় কার্টুন টম অ্যান্ড জেরি।

একঘেঁয়েমি কাটাতে ৩০ বছরেরও কম বয়সী এই দুই অ্যানিমেটর নিজেদের মতো করে ইঁদুর আর বিড়াল নিয়ে কার্টুনের একটি অতি সাধারণ ও খুবই প্রচলিত ধারণা বেছে নেন।  

কার্টুনটির প্রথম পর্বের কাজ শেষ হয় ১৯৩৯ সালে। আর এটি থিয়েটার হলে প্রথম প্রদর্শিত হয় ১৯৪০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি।

টম অ্যান্ড জেরির দুই কারিগর উইলিয়াম হ্যানা ও জোসেফ বারবারা

এটির নাম ছিল ‘পুটস গেটস দ্য বুট’। প্রথম কার্টুনটিতে বিড়ালের নাম ছিল জ্যাস্পার আর ইঁদুরের নাম ছিল জিনক্স।

৯ মিনিট ৮ সেকেন্ডের এই কার্টুন শ্রেষ্ঠ অ্যানিমেটেড শর্ট হিসেবে অস্কার জিতলেও অসাধারণ কাজের জন্য অস্কারে স্বীকৃতি পাননি হ্যানা ও বারবারা।

তাদের দ্বিতীয় পরিবেশনা ছিল ‘ওয়ান্ডারফুল ক্যাট অ্যান্ড মাউস কার্টুন’। এর পরই অ্যানিমেটর জন কারের প্রস্তাবে তারা ‘টম অ্যান্ড জেরি’ নামে কার্টুন জগতে রাজত্ব শুরু করেন।

অ্যানিমেশনটি কেন নির্বাক সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে কখনো কিছু বলেননি বারবারা। নির্বাক যুগের বিখ্যাত কমেডিয়ান চার্লি চ্যাপলিন ছিলেন তার অনুপ্রেরণা।

সংলাপ ছাড়াও যে কোনো চরিত্র আনন্দদায়ক হতে পারে তার অনন্য উদাহরণ তিনি। টম আর জেরি আরেকবার প্রমাণ করেছে সংলাপই মুখ্য নয়।

এ যাবত টমের চেহারাতেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ১৯৪০ এর শুরুর দিকে তার চেহারা ছিল অনেকটি এরকম— রোমশ পশম, মুখে অসংখ্য ভাঁজ, দুই ভ্রুর মাঝখানে গভীর ভাঁজ।

এই বৈশিষ্ট্যগুলো পরে আরো মসৃণ করা হয় তবে জেরি রয়ে গেছে অপরিবর্তিতই। ১৯৪০ এর মাঝামাঝি থেকে, সিরিজটি আরো বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছেন ১৯৪২ সালে এমজিএম-এ যোগ দেয়া টেক্স এভারি।

প্রথম দুই দশকে হ্যানা ও বারবারা শতাধিক পর্ব নির্মাণ করেছিলেন। যার এক একটি নির্মাণে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যেত। আর প্রতি পর্বে খরচ হতো ৫০ হাজার ডলার।

এত পরিশ্রম, এত খরচ করেও আর্থিক দিক দিয়ে তারা খুব বেশি লাভবান হতেন না। তবে তাদের স্বার্থকতা হলো বিশ্বে ‘টম অ্যান্ড জেরি’ শ্রেষ্ঠ। যা আরো ছয়বার এনে দেয় অস্কার।

৮০ বছর পরেও এর আবেদন বিন্দুমাত্র কমেনি

৮০ বছর পরেও এর আবেদন বিন্দুমাত্র কমেনি। বাচ্চা থেকে বুড়ো প্রায় সবারই প্রথম পছন্দ এই কার্টুন। এখনো এই কার্টুন দেখতে বসলে যে কেউ তার ছেলেবেলায় ফিরে যাবে। এই অ্যানিমেশন চিরদিন অম্লান থাকবে।

চীনে ‘টম অ্যান্ড জেরি’মোবাইল গেমস খেলে প্রায় ১০ কোটি শিশু। যুক্তরাজ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও বেশ জনপ্রিয় এই সিরিজ।

হ্যানা মারা যান ২০০১ সালে আর বারবারা ২০০৬ সালে। বর্তমানে এই কার্টুনের স্বত্বাধিকারী ওয়ার্নার ব্রাদারস।  ২০১৯ সালের বড়দিনের উৎসবকে সামনে রেখে এই কার্টুন ছবির সর্বশেষ লাইভ অ্যাকশন চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে।

কার্টুন ছবিতে টম আর জেরির অনন্ত লড়াই দেখে আনন্দিত হননি, দুনিয়ায় এমন মানুষ বিরল। সবসময়ই বোকা টম চালাক জেরিকে ফাঁদে ফেলার পরিকল্পনা করে, সবসময় সেই ফাঁদে সে নিজেই পড়ে।

কার্টুনের দুনিয়ায় তাদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়েছিল পোর্কি পিগ আর মিকি মাউসের সাথে। সেই সময় দুজন নির্মাতারই ছিল ৩০ এর নিচে বয়স।

জো বারবারা বিবিসিকে জানিয়েছেন, বারংবার একই ধরনের গল্প ফিরে আসলেও টম-জেরির দ্বন্দ্ব, বিবাদ আর ধাওয়া করার সাদামাটা গল্প তাকে আনন্দ দিতো। প্রথম বাজারে আসার পরই বাজিমাত করে টম অ্যান্ড জেরি। অভিষেকেই কার্টুন সিরিজটি অস্কারে সেরা অ্যানিমেটেড শর্টফিল্ম ক্যাটেগরিতে মনোনীত হয়।

টম অ্যান্ড জেরির অধিকাংশ জনপ্রিয় পর্বেই কোনো সংলাপ নেই। তবে প্রথমে এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। কিন্তু চার্লি চ্যাপলিনের সমসাময়িকে বেড়ে ওঠা টম অ্যান্ড জেরির অ্যানিমেটররা ভেবেছিলেন সংলাপ ছাড়াই এই কার্টুন মানুষকে বিনোদিত করতে পারবে। এই কার্টুন সিরিজের আবহ সংগীত তৈরি করেছিলেন স্কট ব্রাডলি। এমনকি, টম যে বিভিন্ন দৃশ্যে মানুষের মতো চিৎকার করে, এই আওয়াজ অ্যানিমেটর বিল হান্নার নিজেরই।

এই কার্টুন ছবির প্রথম ১০০ পর্ব নির্মাণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন ওই দুই অ্যানিমেটর। প্রতি দুই সপ্তাহ পরপর টম অ্যান্ড জেরির নতুন এক পর্ব মুক্তি দেওয়া হতো। তাই নতুন পর্ব নির্মাণ ছিল এক হিসেবী পদক্ষেপ। কারণ ৫০ হাজার ডলার অনেক টাকা। এভাবেই টম অ্যান্ড জেরি একদিন দুনিয়ার সেরা কার্টুন ছবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। লাভ করে সাতটি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড।

যুগের পর যুগ জনপ্রিয়তায় রয়েছে টম অ্যান্ড জেরি সিরিজ

এরমধ্যেই, ১৯৫০ সালের দিকে ওই কার্টুন ছবির প্রযোজক ফ্রেড কুইম্বি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। খরচ কমাতে মেট্রো গোল্ডউইন মেয়ার তাদের অ্যানিমেশন শাখা বন্ধ ঘোষণা করে। প্রতিষ্ঠানটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বানানো বিভিন্ন অংশ নিয়ে নতুন পর্বগুলো নির্মাণ করবে।

১৯৫৭ সালে হান্না ও বারবারা দুজন মিলে নতুন একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে সেখান থেকে টম অ্যান্ড জেরি নির্মাণ শুরু করেন। ১৯৬১ সালে মেট্রো গোল্ডউইন মেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় টম অ্যান্ড জেরি কার্টুন তারা থার্ড পার্টি প্রাগ স্টুডিওর কাছ থেকে কিনবে।

১৯৭০ সালে বিল হান্না ও জো বারবেরা আবার টম অ্যান্ড জেরি নির্মাণে ফিরে আসেন। ১৯৯২ সালে গান ও সংলাপসহ টম অ্যান্ড জেরির একটি মিউজিকাল ফিল্ম মুক্তি পায়। ২০১৫ সালের বিবিসি জরিপে দেখা যায় ব্রিটেনে প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যেও সবচেয়ে জনপ্রিয় টম অ্যান্ড জেরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *