‘জয় বাংলা বাংলার জয়’গানটির সৃষ্টির কথা

‘জয় বাংলা বাংলার জয়’গানটির সৃষ্টির কথা

মোহাম্মদ রবিউল্লাহ: তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ডাক দেন। দেশের মানুষ সেই ডাকে সাড়া দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বঙ্গবন্ধু ভাষণ শেষ করলেন ‘জয় বাংলা’ বলে।

এই ‘জয় বাংলা’ ছড়িয়ে গেল সবখানে। সেদিনের সন্ধ্যাতেই ফার্মগেটের বিখ্যাত এক রেকর্ডিং স্টুডিওতে বসে আছেন গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার। সেখানে ছিলেন তার স্কুলের শিক্ষক সালাহউদ্দিন আহমেদ।

তিনি গাজী মাজহারুলকে বললেন, ‘জয় বাংলা’ নিয়ে একটা কাজ করতে পারো। এই সময়ে এটা খুব জরুরি। মানুষ অনেক উৎসাহ পাবে।

গাজী মাজহারুল আনোয়ার ভাবতে থাকলেন, ‘জয় বাংলা’ নিয়ে কি লেখা যায়। ভাবতে ভাবতে দ্রুতই গানটার কথা পেয়ে যান। সুরকার আনোয়ার পারভেজকে ফোন করে স্টুডিওতে আসতে বললেন তিনি।

সঙ্গে আনতে বললেন তার বোন শাহিনকেও (সংগীতশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ)। আব্দুল জব্বারকেও আসতে বললেন গাজী মাজহারুল।

হঠাৎ সেই স্টুডিওতে আসলেন আরেক বরেণ্য সুরকার আলতাফ মাহমুদ। তিনি এসে দেখলেন গাজী মাজহারুল লিখছেন। কাগজটা হাতে নিয়েই বললেন, ‘বাহ, দারুণ হয়েছে তো লেখাটা। দে সুর করি।’ কাগজটা নিয়ে হারমোনিয়ামটা টান দিয়ে আলতাফ মাহমুদ সুর করতে শুরু করলেন।

গাজী মাজহারুল বললেন, ‘আনোয়ার পারভেজ আসছেন। আপনি বসেন।’ পরে আনোয়ার পারভেজ, আলাউদ্দিন আলী, জব্বার, শাহিন সবাই এলো। সবাই মিলে গানটি তৈরি হলো। গানটির সুর-সংগীত করল আনোয়ার পারভেজ। শাহিন আর জব্বার গাইল। সঙ্গে অনেক শিল্পীই ছিলেন।

গান তৈরি করে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে গেল সবাই। তিনি শুনে খুব পছন্দ করলেন। বললেন, এই গান দিয়েই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র যাত্রা করবে। এভাবেই রাতারাতি সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে গেল ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটি।

দেশাত্ববোধক ও জাগরণমূলক গান:

জয় বাংলা, বাংলার জয় একটি দেশাত্ববোধক ও জাগরণমূলক গান। ১৯৭০ সালের মার্চে গাজী মাজহারুল আনোয়ার এই গানটি রচনা করেন।

তিনি তৎকালীন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির বঞ্চনা-দুর্দশা আর স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষাকে ছন্দময় করে গানটি রচনা করেছিলেন। গানটি মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

বিবিসির জরিপে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা গান’ হিসেবে ২০টি গানের মধ্যে এই গানটি ১৩তম স্থান পায়।

গানের প্রেক্ষাপটপট:

১৯৭০ সালে ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আবুল খায়ের ছয় দফার আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে ‘জয় বাংলা’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করার উদ্যোগ নেন।

চলচ্চিত্রের জন্য চিত্রপরিচালক ফকরুল আলম চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য তৈরি করেন এবং চলচ্চিত্রটির জন্য গান লেখার দায়িত্ব পান গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার।

আগেই বলা হয়েছে ১৯৭০ সালের মার্চের দিকে ফার্মগেটের রেকর্ডিং স্টুডিওতে গাজী মাজহারুল আনোয়ার ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটি লেখা শুরু করেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন আনোয়ার পারভেজ, তিনি গানটি সুর করেন। শাহনাজ বেগম ও আব্দুল জব্বার গানটিতে কণ্ঠ দেন।

চলচ্চিত্রটি সে বছর সেন্সরে জমা পড়লেও তৎকালীন পাকিস্তান সরকার চলচ্চিত্রটির মুক্ত আটকে দিলে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সালের ২৬ জানুয়ারি মুক্তি পায় চলচ্চিত্রটি।

তবে চলচ্চিত্রটি মুক্তির আগেই পরিচালক সালাউদ্দিনের মালিকানাধীন ‘ঢাকা রেকর্ড’ চলচ্চিত্রটির গান ও সংলাপ প্রকাশ করে। সেই সময় ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটি জনপ্রিয় হয় উঠে।

মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহার:

মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা ও দেশবাসীর মনোবলকে উদ্দীপ্ত করতে “স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র” অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছিল।

যুদ্ধের সময়ে প্রতিদিন মানুষ অধীর আগ্রহে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শোনার জন্য অপেক্ষা করত। “জয় বাংলা, বাংলার জয়” গানটি এ বেতার কেন্দ্রের সূচনা সঙ্গীত হিসাবে প্রচারিত হতো।

মুক্তিপিপাসু মানুষের চেতনায় আগুন:

জয় বাংলা বাংলার জয়

জয় বাংলা বাংলার জয়

হবে হবে হবে হবে নিশ্চয়

কোটি প্রাণ এক সাথে জেগেছে অন্ধ রাতে

নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়…’

এই গানের মধ্য দিয়ে মুক্তির সংগ্রামে উদ্দীপ্ত হয়ে হানাদার বধে এগিয়ে যায় বাংলার ছাত্র, কৃষক, শ্রমিকসহ সব শ্রেণির জনতা। গানটি বাংলার মুক্তিপিপাসু মানুষের চেতনায় আগুন ধরায়।

যার কারণে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটিকেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রণসংগীত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-নির্বিশেষে এই গানকে আরাধ্য করেই মুক্তির পথে এগিয়ে যায় সমগ্র বাঙালি। এই গান স্বাধীন বাংলা বেতারের সূচনা সংগীত; জাতীয় স্লোগানও বটে।

মহান মুক্তিযুদ্ধে কালজয়ী ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটি সারা জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছে, সেই গানের সুরস্রষ্টা আনোয়ার পারভেজ। আনোয়ার পারভেজ ২০০৬ সালের ১৭ জুন প্রয়াত হয়েছেন। বেঁচে আছেন গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার।

সুর স্রষ্টা আনোয়ার পারভেজ এর ভাষ্য:

জীবনকালে এক সাক্ষাৎকারে আনোয়ার পারভেজ শুনিয়েছিলেন ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’গানটির সৃষ্টির কথা। স্মৃতিচারণায় আনোয়ার পারভেজ বলেন, “৭০ সালের কথা। ফকরুল ভাইয়ের ছবি “জয় বাংলা”–তে সংগীত পরিচালনা করছি। একে তো ছয় দফা নিয়ে ছবি, তাতে আবার গাজী (গাজী মাজহারুল ইসলাম) ঠিক করল ছবির জন্য অসাধারণ কিছু গান লিখবে।”

“গান তো লিখল, কিন্তু এমন অবস্থা যে সুর করার জন্য যে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের সঙ্গে কোথাও বসব, সেই জায়গাটাই পাই না। ঠিক করলাম রাস্তায় দাঁড়িয়েই সুর করে ফেলব। এখন যেটা সংসদ ভবন, তখন আমরা চিনতাম “সেকেন্ড ক্যাপিটাল” বলে।”

“সেই সেকেন্ড ক্যাপিটালের উল্টো দিকে গলির ভেতর রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাজীকে বললাম, দোস্ত গানটা বের কর। ও বলে, আরেকবার একটু কলম চালাতে পারলে হতো। আমি দেখলাম, সে সময় কই।”

” তাড়াতাড়ি ওর হাত থেকে গানটা নিয়ে দেখি, কী অসাধারণ কথার এক গান। ধমক দিয়ে বললাম, এর আর বদলাবি কী? আয়, সুর করে ফেলি। ২০ মিনিট! মাত্র ২০ মিনিটে আমরা তৈরি করে ফেললাম। তখন সবার মুখে মুখে ফেরা সেই “জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানের কম্পোজিশন।’’

স্মৃতি দরজায় কড়া নেড়ে আনোয়ার পারভেজ আরও বলেন, “সেদিন গান তো তৈরি হলো, কিন্তু ভয় ওই রেকর্ডিং নিয়ে। জব্বার ভাইদের বলা হলো। কিন্তু চারদিকে তখন সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘুরে বেড়াচ্ছে।”

“এমন গান রেকর্ড করা মারাত্মক ঝুঁকির কাজ। তারপরও জায়গা ঠিক হলো ইন্দিরা রোডের ঢাকা রেকর্ডিং স্টুডিও। গভীর রাতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে শুরু হলো রেকর্ডিং।”

“বাইরে কী হচ্ছে, আমরা ভেতর থেকে কিছুই টের পাচ্ছি না। রেকর্ডিং শেষ হতেই বাইরে এসে দেখি, ওরে বাবা রে বাবা! সেই নিশুতি অন্ধকারে কোত্থেকে লোকজন খবর পেয়েছে এখানে “জয় বাংলা” ছবির গান রেকর্ডিং হচ্ছে।”

আর যায় কোথা! কয়েক শ লোক মিলে শুরু করেছে স্লোগান “জয় বাংলা”। আমরা দেখলাম এ তো মস্ত বিপদ। ওদিকে পাশে সেনাদের ক্যাম্প। এখন ধরা পড়লে রিলটিল সব নিয়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা পালালাম পেছনের দরজা দিয়ে। একেবারে রাজাবাজার হয়ে যার যার বাড়ি।”

আনোয়ার পারভেজ বলেছিলেন, ‘“জয় বাংলা” গানটার কথা মনে হলে আরেকটা কথা খুব মনে পড়ে, তা হলো এই ছবির আবহসংগীত ধারণ। একের পর এক এসব ঘটনা ঘটার পর আবহসংগীত রেকর্ডিংয়ের জন্য বাংলাদেশে কোনো স্টুডিওই আর নিরাপদ মনে হচ্ছিল না।”

” ফকরুল ভাই ঠিক করলেন একেবারে বাঘের ঘরে গিয়েই কাজ সারবেন। পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে। সমস্যা হলো, ছবির আসল নামে কাজ করতে গেলে অনুমতি তো পাওয়াই যাবে না, বরং ধরে জেলে পুরবে।”

“অতএব নাম বদলে করা হলো “সংঘাত”। ওই তথাকথিত “সংঘাত” ছবির আবহসংগীত করতে আমরা চলে গেলাম লাহোরে। তাও যদি এক স্টুডিওতে কাজ সারা যেত!”

“পুরো রিল দেখলে মূল ব্যাপার ফাঁস হয়ে যাবে এই ভয়ে অন্তত গোটা পাঁচেক স্টুডিওতে ভাগ ভাগ করে রেকর্ডিং করা হলো। সৃষ্টি হলো “জয় বাংলা”।’’

গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ভাষ্য:

এক সাক্ষাৎকারে গানটির গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ” আমার লেখা কথার আনোয়ার পারভেজ যে সুরের অলংকার পরিয়ে দিয়েছিলেন, তা মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছে।”

“লেখক–সাংবাদিকের কাছে তাঁর কলম, কণ্ঠশিল্পীর কাছে তাঁর কণ্ঠ আর গীতিকারের কাছে তাঁর গান ছিল তখন অস্ত্র। আমি মনে করি, “জয় বাংলা বাংলার জয়” গানটি মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয়টা মাস মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে।”

“এ গান একটি যুদ্ধ, এ গান একটি স্বপ্ন, এ গান একটি বাস্তবতা। এ গানেই দেশের সব চাওয়ার কথা, মুক্তির স্বপ্নের কথা বলা হয়েছে।”

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও অনুবাদক।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *