জৌলুশ হারায়নি যাত্রা শিল্প!

এক সময়ে গ্রাম-গঞ্জের শহর-নগরের অলিতে-গলিতে বিভিন্ন উৎসব অথবা বিশেষ দিবস পালনে যাত্রা পালার আয়োজন করা হতো। সময়ের প্রভাবে গত দুই যুগ ধরে জনপ্রিয় যাত্রাপালার ভাটা পড়লেও জৌলুশ হারায়নি যাত্রা শিল্প। আজও মানুষের মনের মুকুটে জনপ্রিয়তা এবং চিত্র বিনোদনে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে যাত্রাপালা।

সুস্থ ধারার শিল্প চর্চা করা গেলে এখনো শিক্ষা বিনোদন ও সামাজিক মেলবন্ধের এক মাত্র জনপ্রিয় মাধ্যম হতে পারে যাত্রাপালার ছবি। শুধু তাই নয় মান বজায় রেখে যাত্রাপালা ব্যাপক হারে করা গেলে সম্ভাবনাময় এ শিল্পে শত-শত মানুষের রুজি রোজগারের ব্যবস্থাও হবে। জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। অর্থ নীতির চাকা গতিশীল হবে।

আশি ও নব্বইয়ের দশকের দিকে বাংলার বুকে যাত্রাপালার সোনালি দিন ছিল। বাংলার পথে প্রান্তরে যেখানেই মানুষ যাত্রাপালা অনুষ্ঠানের খবর শুনতে পেতেন দলবেধে শত-শত আমজনতা অনুষ্ঠান দেখার জন্য ভিড় জমাতেন।

এক সময় বৈশাখী মেলা গ্রাম-গঞ্জের প্রাণের মেলা ছিল। সেই মেলার মূল আকর্ষণই ছিল যাত্রাপালার অনুষ্ঠান। বিশেষ করে -লাইলী মজ্নুর প্রেম কাহিনী, আপন দুলাল, যাত্রাপালার ব্যাপক চাহিদা ছিল। আয়োজকরাও ব্যবসায়িকভাবে ভালোই লাভবান হতেন।

যাত্রাপালার শিল্পীরা জানান, দুই হাজার সালের পর থেকে যাত্রা শিল্পী ও শিল্পে ধস নামে। ধর্মীয় চাপ ও রাজনৈতিক দলের চাপে এ শিল্প আলো থেকে গভীর আঁধারে ঢেকে যায়। যার কারণে দেশের শত-শত যাত্রা কর্মী ও শিল্পী বেকার হয়ে পড়ে।

যাত্রাপালা নিয়ে গবেষণা করে এমন সাংস্কৃতিমনা পন্ডিতদের ভাষ্যমতে, সারা দেশে প্রায় ৫০ হাজার যাত্রা কর্মী ও শিল্পী বেকার হয়ে পডেছে। এ শিল্পে একটা সময় প্রায় এক লাখ লোক কাজ করেছে।

যাত্রাপালার প্রশিক্ষণ এবং প্রচার -প্রসারে ব্যাপকভাবে ভূমিকা পালন করে নাম ডাক কামিয়েছে দেশের বেশ কয়েকটি জেলা। এর মধ্যে আছে মানিকগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, জামালপুর ও গাজীপুর। এ সকল জেলার মধ্যে মানিকগঞ্জ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ছায়ার প্রভাব বিস্তার অনেক অংশে বেশি।

মানিকগঞ্জের প্রবীণ যাত্রা শিল্পী লাল মিয়া সরকার জানান, দেশের ঐতিহ্যবাহী যাত্রা শিল্পকে ষড়যন্ত্র করে থামিয়ে দেয়া হয়েছে। হাজার-হাজার যাত্রা কর্মীকে বেকার করে তাদের পারিবারকে পথে বসিয়েছে। দেশি-বিদেশি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক মহলের চাপে সরকার যাত্রা পালা অনুষ্ঠানের অনুমতি দিতে পারেন না বলে তিনি জানান।

জামালপুর জেলার মধ্যে অন্যতম যাত্রাপালা ও যাদু শিল্পী এ কে আজাদ জানান, দৈনিক তিনি তিন থেকে চার হাজার টাকা উপার্জন করতেন যাত্রাপালা থেকে। বর্তমানে যাত্রায় ভাটা পডায় মুদির দোকান দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

তিনি আরো বলেন, যাত্রাপালার ভাটা পডলেও জৌলুশ হারায়নি যাত্রা সিনেমার। যদি সরকার এবং এ শিল্পে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উদ্যেগী হয়। তাহলে যাত্রা তার আবারও হারানো গৌরব ফিরে পাবে। সরকারের অথর্নীতিতেও গতি আসবে।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম গুরু সাধক গাজীপুরের লোহা গাছিয়ার ফকির আব্দুল খালেক সাঁই বলেন, দেশের -ঐতিহ্যবাহী যাত্রা শিল্পে নানা জটিলতা দেখা দেয়ায় এ শিল্প আজ অস্তিত্ব সংকটে পডেছে। ধর্মীয় প্রভাব রাজনৈতিক প্রভাব সরকারের অবহেলা নানা জটিলতায় জর্জরিত এ শিল্প। এ শিল্পকে বাঁচাতে হলে ও শিল্পীদের কর্মমুকী করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এক সাথে কাজ করতে হবে।

এক সময়ের যাত্রাপালার পৃষ্ঠপোষক জামালপুরের শাহাদাত হোসেন বলেন, এক সময় যাত্রাপালার সোনালি দিন ছিল। সাপ্তাহ থেকে মাস এভাবে যাত্রার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো।

যাত্রাপালার মাঝে অশ্লীলতা- নোংরামি বন্ধের কার্যকরি কোন প্রদক্ষেপ গ্রহণ না করায় এবং ভাল পৃষ্ঠপোষক না পাওয়ায় এ শিল্প ধ্বংসের অনেকে সুযোগ নিয়েছে। যাত্রা ও শিল্পীদের বাঁচাতে সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের এগিয়ে আসতে হবে।

সাংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, সংশ্লিষ্ট সবাই মিলে এক সাথে কাজ করলে এ খাতে আবারও সোনালি দিন ফিরে আসবে। দেশের ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা হারানো গৌরব পূণরায় ফিরে পাবে। মানুষের মাঝে শিক্ষা বিনোদনের ডিজিটাল প্লাটফর্ম চলে আসবে।

তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডাঃ মুরাদ হাসান জানান, দেশের করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে

যাত্রাপালার সথে সংশ্লিষ্ট সকল মহলের সঙ্গে কথা বলে যাত্রা শিল্প উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

লেখক: এম.এস. রুকন ,গাজীপুর ।

আরো দেখুন

Leave a Comment