জো বাইডেন সরকার: এশিয়া ও বাংলাদেশ

জো বাইডেন সরকার: এশিয়া ও বাংলাদেশ

আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০ জানুয়ারির শপথের পর এশিয়ার পাশাপাশি তার মিত্র দেশগুলোকে আরও বেশি গুরুত্ব দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বাইডেন এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে কী নীতি গ্রহণ করছেন তা দেখাতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এশিয়া।

চীনের ক্রমবর্ধমান উত্থানের মধ্যেই জো বাইডেন আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন বাইডেনের মাধ্যমে এশিয়ার সাথে আমেরিকা ভারসাম্য রক্ষা হবে। যা বিস্তৃত এশিয়া- প্রশান্ত মহাসাগরী অঞ্চলের বহুপাক্ষিক ব্যবসা- বাণিজ্য নীতি প্রতিষ্ঠার মানকে সক্ষম করবে।

গত অক্টোবরে একটি মতামতে কলামে জো বাইডেন লিখেছিলেন, “আমরা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের একটি বৃহৎ শক্তি এবং এ অঞ্চলের সমৃদ্ধি, সুরক্ষা ও মূল্যবোধকে এগিয়ে নিতে বন্ধুরাষ্ট্র এবং মিত্রদের পাশে দাঁড়াব আমরা।’’

তাঁর এমন মন্তব্য থেকেই বুঝা যায় এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বজায় থাকবে এবং প্রশান্ত মহাসাগেরের পশ্চিম প্রান্তে শক্তি প্রক্ষেপণ সামনে এগিয়ে যাওয়াই নির্দেশ করে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দায়িত্ব পালনকালে একবারও আসিয়ান নেতৃত্বাধীন পূর্ব এশিয়ার শীর্ষ কোনো সম্মেলনে যোগ দেননি।

এ প্রসঙ্গে ভাবী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তনি ব্লিংকেন বলেছেন, দক্ষিণ পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সহযোগিতা সংস্থা –আসিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে প্রেসিডেন্ট বাইডেন অংশ নেবেন।

বাইডেন প্রশাসনের অংশ হিসেবে এশিয়ায় মনোনিবেশ করার জন্য গত ১৩ জানুয়ারি ইন্দো-প্যাসিফিক বিষয়ক সমন্বয়কারী এশিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কার্ট ক্যাম্পবেলকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সুরক্ষা কাউন্সিলে প্রেসিডেন্টের সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ইন্দো-প্যাসিফিক বিষয়ক সমন্বয়কের দায়িত্ব পালনকালে ক্যাম্পবেল সরাসরি জাতীয় সুরক্ষা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভানের সাথে কাজ করবেন। এশিয়া ও চীন সম্পর্কিত বিষয়গুলোও পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন ক্যাম্পবেল।

হোয়াইট হাউসে পররাষ্ট্রনীতি তৈরিতে যে কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার উপস্থিতি থাকবে তার মধ্যে ক্যাম্পবেলও একজন। ক্যাম্পবেল আঞ্চলিক ও এশিয়াজুড়ে সর্বাধিক কূটনীতিক ও এশিয়ার অঞ্চল সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন বলে তিনি এশিয়া বিশেষজ্ঞ হিসাবেও পরিচিত।

এশিয়ায় মার্কিন নের্তৃত্বের যে ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তা পুনরুদ্ধার করার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা গ্রহণ করবে বাইডেন প্রশাসন এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে।

২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনান্ড ট্রাম্প শপথ গ্রহণের পরপরই ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) থেকে একতরফাভাবে আমেরিকাকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। এখানে ১২ স্টেকহোল্ডার কাজ করছে।

ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে জাপান, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ এশিয়ার ১৫টি দেশ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তিতে স্বাক্ষরের দৃশ্য যুক্তরাষ্ট্রকে দেখতে হয়েছে। ১৫ দেশের চুক্তি বুঝিয়ে দিয়েছে অর্থনৈতিক চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার জন্য এশিয়ার দেশগুলো আমেরিকার অপেক্ষায় থাকে না।

এশিয়া আমেরিকার চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে এই চুক্তিই তা প্রমাণ করে। এ চুক্তিতে আমেরিকার অংশগ্রহণ না থাকার কারণে এশিয়ার নেতৃত্ব চীনের হাতে চলে যাওয়ায় ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারকরা ট্রাম্প প্রশাসেন ওপর কিছুটা বিরক্ত।

বিশ্বের সবচেয়ে গতিশীল উন্নয়নশীল অর্থনীতি রয়েছে এশিয়ায়। বিশ্বের শীর্ষ, দ্বিতীয় ও চতুর্থ বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ যথাক্রমে চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ায় যা এশিয়ায় অবস্থিত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আমেরিকা ও চীনের পরেই ২০৩০ সালের মধ্যে জাপান বিশ্বের চতুর্থ অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠবে বলে আশা করছে আসিয়ান।

পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ ও অঞ্চল পৃথিবীর অন্য দেশের তুলনায় তাৎক্ষনিক ও কার্যকরভাবে করোনা মোকাবেলা করছে। পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ দেশ পশ্চিমা দেশগুলোর চেয়ে করোনা নিয়ে কাজ করেছে, দেশগুলোতে মৃত্যু ও সংক্রমণের হার কম রয়েছে।

এই অঞ্চলটি বিশ্বের উদ্ভাবনী কেন্দ্র হিসাবে পরিবর্তিত হয়েছে।করোনা পরবর্তী বিশ্বের পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্তে এশিয়ার ভাবমূর্তি আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এশিয়া যেদিকে যাচ্ছে বিশ্ব সম্প্রদায়ও তা অনুসরণ করতে হবে। এই অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতিকে বিবেচনায় নিয়ে বাইডেন প্রশাসন বিশেষ নজর দেবেন।

বাইডেন সরকার এশিয়ার কৌশলগত ও পরিবেশগত পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে জেনে ও এই অঞ্চলটির সাথে শান্তি ও স্থিতিশীলতা তৈরির লক্ষ্যে কাজ করার জন্য নতুন করে একটি ভারসাম্য কৌশল প্রণয়ন করছে।

এশিয়ায় ভারসাম্য পূনরুদ্ধার করা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর থেকে আমেরিকা আন্তর্জাতিক পরিবেশে ব্যাপক পরিবর্তনগুলোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে এশিয়ার দিকে কৌশলগত পুনরায় ভারসাম্য রক্ষার উদ্যোগ নেয় এবং এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতায় অবদান রেখে যাচ্ছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুমানের প্রশাসনের অধীনেই এশিয়ার সাথে পুনরায় ভারসাম্য রক্ষা শুরু করে আমেরিকা।

স্টেট ডিপার্টমেন্টের নীতি পরিকল্পনা পরিচালক জর্জ কেনান সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য রক্ষণাবেক্ষণের কৌশল তৈরি করে ১৯৩০ ও ১৯৪০ সালে মনচুরিয়ান দুর্ঘটনা থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা আমেরিকার এশিয়া কৌশলটি সংশোধন করার প্রস্তাব করেন।

এরপর আমেরিকার দৃষ্টি চীন থেকে জাপানের দিকে স্থানান্তরিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান ও আমেরিকা বিরোধী শক্তি হয়ে যুদ্ধ করেছিল তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পাঁচ বছর শেষ হতে না হতেই এ দুটি দেশ মিত্র দেশে পরিণত হয়।

এরপর জাপানকে ব্রেটন উডস আর্থিক ব্যবস্থায় আমন্ত্রণ জানায় আমেরিকা। যার ফলে জাপানের অর্থনৈতিক অলৌকিক উন্নয়ন ঘটে। এরপর পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে জাপানের সম্পর্ক আরও বৃদ্ধি পায়।

পরবর্তীতে দ্বিতীয় ধাপে চীনের সাথে পরস্পরের সম্পর্কের মাধ্যমে এশিয়ার সাথে পুনরায় ভারসাম্য রক্ষা করার নীতি গৃহীত হয় ১৯৭০ সালের শুরুর দিকে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের প্রশাসনের অধীনে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ভারসাম্য বজায় রাখতে ও ভিয়েতনাম থেকে সেনা প্রত্যাহারের স্বার্থে চীনের সাথে অংশীদারিত্বের কৌশলগত পুনর্গঠন করেন নিক্সন ও তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার।

চীন কার্যকরভাবে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি গ্রহণ করে এবং ওয়াশিংটন পরে বেইজিংয়ের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে।

এরপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আদেশের ক্ষেত্রে পরিবর্তিত নীতি গ্রহণ করে। চীনের তৎকালীন নেতা দেং জিয়াওপিংয়ের অধীনে অর্থনীতিতে অলৌকিক পরিবর্তন আসে। তিনি সংস্কার ও মুক্ত নীতি অবলম্বন করে আমেরিকার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেন।

প্রথম ও দ্বিতীয়বার এশিয়ার সাথে নীতি তৈরির মাধ্যমে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৭০ বছরের সময়কালে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরী অঞ্চলের শান্তি বজায় রাখতে সক্ষম হয়।

তবে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনের অধীনে ২০১০ সালে আবার এশিয়া কৌশল পুনরায় ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজন দেখা দেয়। ।

শক্তি ও প্রভাবের জন্য চীন যখন তার পদক্ষেপগুলো ত্বরান্বিত করে তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সহযোগী ও অংশীদারদের সাথে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করার পাশাপাশি এই অঞ্চলে নৌ সক্ষমতা প্রসারিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করে।

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতি ভারসাম্য বজায় রাখার উপর জোর দিয়ে ২০১২ সালের জানুয়ারিতে প্রতিরক্ষা কৌশলগত নির্দেশনা জারি করে পেন্টাগন। পেন্টাগনের নির্দেশনা অনুসরণ করে পরের বছর মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব লিওন প্যানিতা পুরো মার্কিন সামরিক বাহিনীকে প্রায় ৫০-৫০ পরিবর্তে প্রশান্ত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরে ৬০-৪০ বিভক্ত করে দেন। ২০২০ সালের মধ্যেই এমন বিভাজন সম্পন্ন করা হয়।

তবে ওবামা প্রশাসন এশিয়ার সাথে পুনরায় ভারসাম্য রক্ষার কৌশল ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। ওবামার আট বছরের মেয়াদে, মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে খুব কমই বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং সামরিক ব্যয় হ্রাসের ফলে প্রশিক্ষণের জন্য বাজেটও কমানো হয়েছিল।

বারাক ওবামার ব্যর্থতা

বেশ কয়েকটি কারণে ওবামার কৌশল সফল হয়নি। প্রথমত, ওবামা প্রশাসন পুরো এশিয়ার জন্য কৌশল তৈরি করার আগে মার্কিন-চীন সম্পর্কে দিকে খুব বেশি মনোনিবেশ করেছিল এবং চীন নীতির ক্ষেত্রের মধ্যেই এশিয়া নীতি গঠনের চেষ্টা করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কৌশলগত দিকনির্দেশনা ঘোষণার এক মাস পরেই এশিয়াতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয়গুলোতে দুই পরাশক্তির সহাবস্থান করার জন্য “নতুন ধরণের শক্তির সম্পর্ক”স্থাপন করার প্রস্তাব দেয় চীন।

ওই প্রস্তাবটি চীনের উত্থানের পক্ষে আরও উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করেছিল কারণ ওবামা প্রশাসন ওই প্রস্তাব সাদরে গ্রহণ করেছিল। এক সময় চীনকে বৃহত্তর ভূমিকা পালন করার জন্য স্বাগত জানিয়েছিল ওবামা প্রশাসন।

দ্বিতীয়ত, চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যে দক্ষিণ চীন সাগরে স্কার্বারোফ শোলকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক বিরোধের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে সেখানে নিয়মিত উপস্থিতি বজায় রাখার সুযোগ করে দিয়েছিল।

দক্ষিণ চীন সাগরে স্প্রেটলি দ্বীপপুঞ্জে কৃত্রিম দ্বীপপুঞ্জ ও সামরিক সুবিধাগুলো তৈরির বিষয়ে চীনের সংশোধনবাদী পদক্ষেপগুলোও আটকাতে ব্যর্থ হয়েছিল ওবামা প্রশাসন যার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ বৃদ্ধি পায়।

এরপর ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দার পরে আমেরিকা বিশ্ব নের্তৃত্ব থেকে ছিটকে পরে। অন্য দিকে হাই-টেক সাইবার পাওয়ার স্থাপন, ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফাইভ জি টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও ভূ-অর্থনৈতিক হুমকি মোকাবিলার মাধ্যমে অর্থনৈতিক শক্তির অগ্রগতি ধরে রাখে চীন।

বিশ্বায়নের প্রভাব, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে অংশ হিসেবে ঘরোয়া শিল্প উত্থানের ফলে যে রাজনৈতিক বিভাজন ঘটেছিল সেগুলো মোকাবিলার ক্ষেত্রেও আমেরিকা সক্ষমতার দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। যার সুফল ঘরে তোলে চীন।

ওবামা প্রশাসন টিপিপি আলোচনা শেষ করতে পেরেছিল তবে চুক্তিটি অনুমোদন করতে ব্যর্থ হয় কারণ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমেরিকার রাজনীতিবিদ ও জনগণের আপত্তির কারণে ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ বাণিজ্য চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরে আসতে হয়েছিল।

২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়, শুধু ট্রাম্প নয়, হিলারি ক্লিনটনসহ অন্যান্য বড় সম্ভাব্য প্রার্থীরাও টিপিপিতে আমেরিকার যুক্ত হওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন।

ওবামা প্রশাসনের নীতি ব্যর্থ হওয়ার কারণগুলো বাইডেন প্রশাসনের অবশ্যই মূল্যায়ন করতে হবে এবং সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে এ অঞ্চলে একটি নতুন ভারসাম্য কৌশল নিয়ে আসবেন এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে।

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি বিস্তৃত ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য নীতি প্রতিষ্ঠা করাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাইডেন প্রশাসনের।

আমেরিকান স্বার্থগুলো শুল্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যবসায়িক মান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও আইনের বিধি ও নিয়ম কঠিনভাবে অনুসরণ করা হয়।

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগে চীন সবচেয়ে বেশি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র যত ধীরে ধীরে বহুপক্ষীয় নীতিতে যুক্ত হচ্ছে চীন তত বেশি লাভবান হচ্ছে।

২০১৩ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে সিঙ্গাপুরে জাপানের তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সাথে সাক্ষাত হয় জো বাইডেনের। ওই সশয় আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য মার্কিন-জাপান জোটকে বাড়ানোর অংশ হিসেবে টিপিপি চুক্তির এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছিলেন বাইডেন।

বাণিজ্য নীতি সম্পর্কে বাইডেন প্রশাসনের অবশ্যই শ্রমিক ইউনিয়নের সুরক্ষা ও ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির চেয়ে আলাদা একটি নীতি তৈরি করতে হবে। নতুন প্রশাসনের প্রতিযোগিতামূলক সহাবস্থানকে কেন্দ্র করে চীনের জন্য আলাদা নীতিও প্রতিষ্ঠা করবেন ।

প্রতিযোগিতামূলক সহাবস্থানে প্রতিযোগিতা না করলে টিকে থাকা যায় না। আমেরিকা যদি প্রতিযোগিতা করতে ব্যর্থ হয় তবে চীন আধিপত্য বিস্তার করবে। যুক্তরাষ্ট্রকে তার মিত্রদের পাশাপাশি চীনের ভূ-অর্থনৈতিক হুমকির বিরুদ্ধে লড়াই করার কৌশল নিতে হবে।

মিত্রদের নির্ভরশীলতার কমতি

অন্য সিদ্দান্ক নেয়ার আগে করোনা মহামারীর পরে দেশকে পুনর্গঠন করতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবেন বাইডেন। তার মানে বিশ্বব্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ আগের চেয়ে অনেক বেশি কমে যাবে। একই সাথে দেশটির মিত্ররাও যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতা থেকে দূরে থাকবে।

একবিংশ শতাব্দীর কাজের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়ায় ভারসাম্য রক্ষার করার জন্য আরও স্বতন্ত্র ও নির্ভরযোগ্য মিত্রদের সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশল নিতে হবে। তারই অংশ হিসেব বাইডেন প্রশাসন জাপানসহ তার মিত্রদের এগিয়ে যেতে সহায়তা করার কৌশল নেবেন।

এশিয়ার সাথে ভারসাম্য রক্ষা করার এখনই উপযুক্ত সময়। ওবামা প্রশাসন যখন এশিয়ার সাথে ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি নিয়ে আসে তখন এ অঞ্চলের দেশগুলো মনে করেছিল এটি চীন সম্পর্কিত নিয়ন্ত্রণের কৌশল।

এখন জাপান ও এশিয়ার অন্যান্য মার্কিন অংশীদাররা বাইডেন প্রশাসনের কাছ থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ নতুন ভারসাম্য নীতিটি জন্য অপেক্ষা করছে।

বাইডেন সরকার ও বাংলাদেশ

নভেম্বরের নির্বাচনে জো বাইডেনের বিজয়ে ওয়াশিংটনে মিছিল করেন বাংলাদেশী অভিবাসীরা। বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি আমেরিকায় এই ক্ষমতার রদবদলের কোনো প্রভাব আদৌ কি বাংলাদেশের ওপর পড়বে জনমনে এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে আমেরিকার নতুন প্রশাসনের সম্পর্ক কী দাঁড়াবে তার অনেকটাই নির্ভর করবে চীনের সাথে জো বাইডেন কী ধরণের সম্পর্ক চান তার ওপর।

ট্রাম্প সরকার চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় এক ধরনের ”যুদ্ধংদেহী” আচরণ শুরু করেছিল। বাইডেন চীনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রকৃতিতে কিছুটা ভিন্নতা আনার চেষ্টা করবেন। এটিকে বাইডেন মূলত অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ দিতে চাইবেন। চীনের প্রতিবেশীদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক করার চেষ্টা করবেন।

বাইডেন সেই কৌশল নিলে বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি হবে, আমেরিকার সাথে ব্যবসায় নতুন সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু একই সাথে কিছুটা চ্যালেঞ্জও বাংলাদেশের সরকারের জন্য হাজির হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ট্রাম্প বিশ্বের অন্যত্র গণতন্ত্র নিয়ে মাথা ঘামাননি। বাইডেন গণতন্ত্র নিয়ে বেশি মনোযোগী হবেন। সেখানে বাংলাদেশের বাড়তি কাজের প্রয়োজন হতে পারে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র, বাক-স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে পশ্চিমাদের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই নানা আপত্তি-উদ্বেগ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিশ্লেষকরা বলছেন, ডেমোক্র্যাটরা সবসময়ই গণতন্ত্র বা মানবাধিকার নিয়ে বেশি মাথা ঘামায়, কিন্তু বাইডেনের সামনে এই মুহূর্তে প্রধান চ্যালেঞ্জ আমেরিকার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি।

এছাড়া আমেরিকার ভেতরেই এখন বাক-স্বাধীনতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠছে। বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানি যেভাবে তাদের ক্ষমতা এবং প্রভাব দেখাচ্ছে তাতে এই বিতর্ক বাড়তেই থাকবে। এই অবস্থায় বাইরের বিশ্বে গণতন্ত্র বা বাক-স্বাধীনতা নিয়ে বাইডেন কতটা নজর দিতে পারবেন বা সেই খবরদারির নৈতিক অধিকার কতটুকু তার প্রশাসনের থাকবে তা নিয়ে আমেরিকার ভেতরেই অনেক কথাবার্তা চলছে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে বাইডেন সরকার ততটা মনোযোগ না দিলেও, রোহিঙ্গা সমস্যার মত কিছু ইস্যু যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাড়তি গুরুত্ব পেতে পারে। বৈদেশিক সহযোগিতার বিষয়টি ট্রাম্পের সময়ে যেভাবে গুরুত্ব হারিয়েছে তাতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক স্তরে মিয়ানমারের ওপর যে শক্ত চাপ তৈরির প্রয়োজন ছিল, তা হয়নি। সেই অবস্থার ইতিবাচক কিছু পরিবর্তন হতে পারে।

রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে বাইডেন বেশি গুরুত্ব দেবেন কারণ পররাষ্ট্র দপ্তরে ও জাতীয় নিরাপত্তা স্তরে এমন কিছু লোক তিনি নিয়োগে করেছেন যারা দক্ষিণ এশিয়াকে ভালো জানেন।

জো বাইডেনের জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগে এশিয়া প্রশান্ত-মহাসাগরীয় অঞ্চলের দায়িত্ব যিনি পাচ্ছেন সেই কার্ট ক্যাম্পবেল এই অঞ্চল সম্পর্কে খুবই ওয়াকিবহাল। পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশ যদি ওয়াশিংটনে নতুন সরকারের সাথে ঠিকমত কূটনৈতিক দেন-দরবার করতে পারে, তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সুবিধা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের ওপর চাপ তৈরি করলে, চীনের জন্য তা স্পর্শকাতর হতে পারে। ইতিমধ্যেই চীনের সাথে বাংলাদেশ এ নিয়ে কথা বলছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনকে যদি এক প্লাটফর্মে আনা যায়, তাহলে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের একটি সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা যায়। তার জন্য প্রয়োজন ধারালো বিচক্ষণ কূটনীতি।

লেখক: হিমালয় আহমেদ

সূত্র: দ্য জাপান টুডে ও বিবিসি

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *