গ্ল্যামার গার্ল শারাপোভার হলো সারা; অনুরাগীদের চোখে জল

শারাপোভা

মারিয়া শারাপোভা। নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অসাধারণ সুন্দরের এক প্রতিচ্ছবি। নিজ কর্মগুনে গোটা দুনিয়ায় দ্যুতি ছড়িয়ে চিনিয়েছেন নিজের জাত। খেলোয়াড়ী কৌশল ও অর্জন দিয়ে নিজেকে মেলে ধরেছেন বিশ্ব বাসীর কাছে আপন মহিমায়।

ফর্মে ফেরা, কাঁধের চোট, ডোপ কেলেঙ্কারি সব কিছু ছাপিয়ে অন্য কারণে এবার আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা ও গণমাধ্যমে খবরের হট কেক হয়েছেন শারাপোভা। টেনিসকে একেবারেই ‘গুডবাই’ জানিয়ে দিলেন পাঁচ বারের গ্র্যান্ড স্লামজয়ী রাশিয়ার এ গ্ল্যামার গার্ল।

মাত্র ৩২ বছর বয়সী টেনিস থেকে অবসরের কথা বিখ্যাত দুই ফ্যাশন ম্যাগাজিন ‘ভোগ’ও  ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’কে নিজেই জানিয়েছেন শারাপোভা। সতেরো বছর বয়সে আবির্ভাব, বত্রিশে খেলা থেকে বিদায়। কোর্টে আর দেখা যাবে না সেই মনমোহিনী হাসি। হাত তুলে ট্রেডমার্ক ভঙ্গিতে দর্শকদের আর বিদায় জানাবেন না টেনিস-সুন্দরী।

টেনিসকে বিদায়ের ঘোষণার মধ্য দিয়ে ১৯ বছরের টেনিস কেরিয়ারের ইতি টানলেন। শারাপোভার সঙ্গে সঙ্গে টেনিস-আকাশে অস্ত গেল এক গ্লামার যুগও।

শারাপোভার এই সিদ্ধান্ত শুনে অবাক হয়েছেন গণমাধ্যম কর্মী থেকে শুরু করে দুনিয়াজুড়ে তার ভক্তরা। সবার প্রিয় শারাপোভা খেলা থেকে বিদায়ী সিদ্ধান্তে  খবরে হৃদয়ে ধাক্কা লেগেছে ভক্তদের।

রাশিয়ার গৌরব শারাপোভা:

এ পর্যন্ত মাত্র দশজনের মধ্যে প্রথম কোন রুশ নারী টেনিস বিশ্বে এক নাম্বার হওয়ার গৌরব অর্জন করেন শারাপোভা। টানা ১১ বছর ধরে রেখেছেন ফোর্বসের সর্বোচ্চ উপার্জনকারী নারী খেলোয়াড় হিসেবে নিজের অবস্থান।

চার বছর বয়সেই র‌্যাকেটের সাথে পরিচয়:

আবির্ভাবেই টেনিস কোর্টে ঝড় তুলে শুরু হয়েছিল জয়যাত্রা। সাইবেরিয়ায় জন্ম। ১৯৮৬ সালে চেরনোবিল বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচতে শারাপোভার বাবা-মা চলে এসেছিলেন রাশিয়ার সোচিতে।

সেখানেই চার বছর বয়সে প্রথম টেনিস র‌্যাকেট হাতে তুলে নিয়েছিল খুদে মেয়েটা। ছোট থেকেই লড়াই করে বাঁচতে শিখেছেন শারাপোভা।

তাঁর বাবা ইউরি যখন মেয়ের হাত ধরে ১৯৯৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পা দেন, তখন সম্বল ছিল মাত্র ৭০০ ডলার আর এক বুক স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন নষ্ট হয়ে যেতে দেননি শারাপোভা।

বিশ্ব টেনিসে সপ্তদশী শারাপোভার আগমনী বার্তা:

২০০৪ সালে হাতে যখন ঐতিহ্যবাহী উইম্বলডনের সোনার থালা উঠল, তখনই বিশ্ব টেনিসে নিজের আগমন বার্তা দিয়েছিল সপ্তদশী মারিয়া। তখনই বিশেষজ্ঞরা ভবিশ্যত বাণী করেছিলেন, এই মেয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

এরপর দুটি ফরাসি ওপেন ও একটি করে ইউএস ওপেন ও অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতে কেরিয়ার গ্র্যান্ড স্ল্যাম সম্পূর্ণ করেছিলেন শারাপোভা।

সতেরোর তরুণীর দ্যুতিতে ঝলসে গেল টেনিস দুনিয়া: 

সুইট সিক্সটিনের গণ্ডি পেরিয়ে সদ্য সতেরোয় পা দেওয়া তরুণীর দ্যুতিতে ঝলসে গেল টেনিস দুনিয়া। যখন ২০০৪ সালে, উইম্বলডন ফাইনালে সেরিনা উইলিয়ামসকে হারিয়ে শারাপোভা বুঝিয়ে দিলেন, প্রাণোচ্ছ্বল এক তরুণীর রূপান্তর ঘটছে টেনিস-রাণীতে। উইম্বলডনের ইতিহাসে শারাপোভা ছিলেন তৃতীয় কম বয়সী চ্যাম্পিয়ন।

এর ঠিক এক বছর পরে, ১৮ বছর বয়সে বিশ্বের এক নম্বর নারী টেনিস খেলোয়াড়ের মুকুট ওঠে শারাপোভার মাথায়। সেই প্রথম কোনও রুশ নারী টেনিস বিশ্বে এক নম্বর হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

পরের বছরই শারাপোভার ক্যাবিনেটে জায়গায় হয় যুক্তরাষ্ট্র ওপেন ট্রফির। ২০১২ সালে ফরাসি ওপেন জেতার সঙ্গে সঙ্গে দশম নারী হিসেবে কেরিয়ার গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ীদের তালিকায় নিজের জায়গা করে নেন রুশ সুন্দরী। অলিম্পিক্স পদকও আসে এর পরে।

চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়:

কথায় আছে, চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়…। ২০১৬ সালে আসে কেরিয়ারের সবচেয়ে খারাপ সময়। সে বছর ডোপ টেস্টে ফেল করায় ১৫ মাসের জন্য আন্তর্জাতিক টেনিস থেকে নির্বাসিত হন তিনি।

নির্বাসন কাটিয়ে কোর্টে ফিরলেও নিজের সেরা ফর্মে ফিরতে পারেননি ‘মাশা’। সেইসময় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী সেরেনা উইলিয়ামস, ভিক্টোরিয়া আজারেঙ্কা, পেট্রা কিটোভারা কোর্ট দাপাচ্ছেন।

ফিরে এসে বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি শারাপোভা। মাত্র একটি টুর্নামেন্টের শেষ আটে পৌঁছতে পেরেছিলেন তিনি। তবে গ্র্যান্ড স্ল্যামগুলিতে ক্রমাগত খারাপ পারফরম্যান্সের দরুন হারিয়ে যাচ্ছিলেন শারাপোভা।

২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে অনামী ডনা ভেকিচের কাছে স্ট্রেট সেটে হারের পর আরও তলানিতে যায় তাঁর আত্মবিশ্বাস। তাই বাধ্য হয়েই টেনিসকে বিদায় জানালেন শারাপোভা। শেষ হল টেনিস কোর্টে এক সুন্দর অধ্যায়।

বিদায় বার্তায় যা লিখলেন:

জীবনের অনেক ওঠাপড়াকে সঙ্গী করেই এতগুলো বছর কাটিয়ে দিয়েছেন টেনিস সার্কিটে। ৫ বারের গ্র্যান্ড স্ল্যাম বিজয়ী মারিয়া শারাপোভা টেনিস থেকে বিদায়ের খবরটি বিশ্ব বিখ্যাত দুই ফ্যাশন ম্যাগাজিন ‘ভোগ’ও  ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’ছাড়াও ২৬ ফেব্রুয়ারি-২০২০ বুধবার একাধিক সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টে নিজের বিদায়ের কথা জানান।

নিজের ইনস্টাগ্রামে একটি ছোটবেলার ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, ‘‘টেনিস আমাকে পৃথিবী চিনিয়েছে। এটাই আমাকে জানিয়েছে আমি কী দিয়ে তৈরি। এটা দিয়েই নিজেকে পরীক্ষা করেছি।’’

ছোটবেলার ছবি পোস্ট করে ক্যাপশন দিয়েছেন শারাপোভা

‘‘বেড়ে উঠেছি। তাই জীবনের পরের ধাপে যাই বেছে নিই না কেন, আমার নতুন চূড়া, আমি এমনই থাকবো। আমি চড়তেই থাকব। আমি বাড়তেই থাকব। টেনিসকে গুডবাই জানাচ্ছি। আমি টেনিসকে নিজের জীবনটা দিয়েছিলাম, টেনিসও আমাকে নতুন জীবন দেয়।’’

এদিকে মারিয়া শারাপোভা টুইটেও বিদায়ে লেখেন, ‘‘টেনিস আমাকে বিশ্বকে দেখিয়েছে—সেটা আমাকে দেখিয়ে আমি কী দিয়ে তৈরি হয়েছি। এখান থেকেই আমি নিজেকে পরখ করেছি, নিজের পরিমাণ মেপেছি।’’

‘‘ এবার পরের অংশে আমি কী বেছে নেব, যাই হবে আমার পরবর্তী পাহাড়, আমি এগিয়ে যাবো। আমি উঠতে থাকবো, বড় হতে থাকব।”

দীর্ঘদিন ধরে টেনিস দর্শককে মাতিয়ে রাখা:

বর্তমানে বিশ্বের ৩৭৩ তম খেলোয়াড় মারিয়া, এক সময় টানা ১ নম্বরে থেকেছেন। কাঁধে চোট, ডোপ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে নির্বাসন, ফিরে আসা, আত্মজীবনী, গ্ল্যামার, সেরেনা উইলিয়ামসের সঙ্গে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতা, সুগারপোভা টফির ব্যবসা, ফ্য়াশন ও প্রেম—এককথায় মারিয়া শারাপোভা দীর্ঘদিন ধরে টেনিস দর্শককে মাতিয়ে রেখেছিলেন তাঁর নানা কার্যকলাপে।

সম্প্রতি ফর্ম হারিয়ে একাধিক চ্যালেঞ্জ থেকে হেরে যাচ্ছিলেন শারাপোভা। অনেকেই তাঁর সরে দাঁড়ানো, টেনিস থেকে বিদায় নেওয়া নিয়ে কাটাছেঁড়া শুরু করেছিলেন। তবে সর্বদা যোদ্ধা মারিয়া বেশ কিছুটা সময় নিয়েই শেষ পর্যন্ত অবসর ঘোষণা করেই ফেললেন।

ডোপ কেলেঙ্কারি ও আবেদন অগ্রাহ্য:

২০১৬ সালের মার্চে এক সংবাদ সম্মেলনে শারাপোভা জানান, সে বছর অস্ট্রেলীয় ওপেনের ডোপ পরীক্ষায় ধরা পড়েছে, তিনি মেলডোনিয়াম নিয়েছেন।

হৃদরোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই ওষুধটি নেওয়া হয়। ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নিষিদ্ধ ওষুধের তালিকায় চলে গিয়েছিল মেলডোনিয়াম।

শারাপোভা জানিয়েছিলেন, শারীরিক সমস্যার জন্য ২০০৬ সাল থেকে এই ওষুধ খাচ্ছেন তিনি। তার জানা ছিল যে না মেলডোনিয়াম নিষিদ্ধ হয়ে গেছে।

শারাপোভার আবেদন অগ্রাহ্য করে তাঁকে প্রথমে দু’বছরের জন্য নির্বাসনে পাঠানো হয়। পরে যা কমে ১৫ মাসে দাঁড়ায়। সেই নির্বাসন থেকে ফেরার পরে চোট-আঘাতের সমস্যায় জর্জরিত পরেন লাস্যময়ী এ টেনিস তারকা।   

বিদায় জানানোর নেপথ্যের কারণ:

টেনিস থেকে চূড়ান্তভাবে বিদায়ের পেছনের কারণ নিজেই জানান সুন্দরী শারাপোভা। শারাপোভা জানিয়েছেন, নির্বাসন কাটিয়ে ফিরে এসে খুব একটা সাফল্য পাননি তলানিতে ঠেকেছে ফর্ম। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ওপেনে সেরিনা উইলিয়ামসের কাছে ১-৬, ১-৬ হারের পরেই তিনি বুঝে যান, আর নয়।

সঙ্গে হাতের চোটেও ভুগতে হয়েছে গত বছরটা। উইম্বলড‌ন, অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ও ইউএস ওপেনের প্রথম রাউন্ড থেকেই ছিটকে যেতে হয়েছিল।

দীর্ঘদিন ধরে কাঁধের চোটের জন্য ভুগছিলেন তিনি। তার প্রভাব পড়ছিল খেলায়। সেরা ফর্মের ধারেকাছেও ছিলেন না। এই  মৌসুমে দুটি ম্যাচ পরপর হারের পর আরও মুষড়ে পড়েছিলেন টেনিস সুন্দরী। শেষমেশ কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললেন। মাত্র ৩২ বছর বয়সে আলবিদা জানালেন প্রিয় খেলাকে।

তার ভাষায় ‘‘ওই ম্যাচের ত্রিশ মিনিট আগে কাঁধের চিকিৎসা করাই, যাতে কোনওভাবে ম্যাচটা খেলতে পারি। যদিও কাঁধের চোট আমার কাছে নতুন নয় তবে সেদিন কোর্টে নামতে পারাটাই আমার কাছে জয়ের মতো ছিল।’’        

নিজেকে সময় দেবেন শারাপোভা:

আপাতত ক’টা দিন নিজেকে সময় দিতে চান বহু পুরুষের হৃদয়ে ঝড় তোলা এই রুশ সুন্দরী। ‘‘পরিবারের সঙ্গে নিভৃতে সময় কাটাব। সকালে উঠে আলস্যের সঙ্গে কফির কাপে চুমুক দেব। সপ্তাহান্তে কোনও অচেনা জায়গায় হারিয়ে যাব আর পছন্দের নাচের ক্লাস তো আছেই।’’

শারাপোভার যত অর্জন:

শারাপোভা একটি করে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন (২০০৮), উইম্বলডন (২০০৪) ও ইউএস ওপেন (২০০৬) ছাড়াও জিতেছেন দুটি ফ্রেঞ্চ ওপেন (২০১২ ও ২০১৪)। সাবেক এক নাম্বার ক্যারিয়ারে জিতেছেন ৩৬টি ডব্লুটিএ শিরোপা।

নিজের ঘরে নিয়েছেন আর্থ শো অলিম্পিকের পদকও । শুধু টেনিস খেলাতে নয় মডেল হিসেবেও খ্যাতির চূড়ায় অবস্থান করেছিলেন তিনি।

পাঁচটি গ্র্যান্ড স্লাম বিজয়ী এ খেলোয়াড় রূপে ও গুণে অনন্যা। এ গুণ আর রূপ তাকে এনে দিয়েছে কোটি কোটি ডলারও। তবে কোর্টের চেয়েও বাইরের ভুবন থেকে বেশি উপার্জর করেছেন তিনি।

তার অনিন্দ্যসুন্দর মুখশ্রীকে নিজেদের পণ্যের প্রচার ও প্রসারের কাজে লাগিয়েছে বিশ্বখ্যাত নামী দামি ব্র্যান্ড। এর মধ্য দিয়েও শারাপোভার ঘরে কোটি ডলার এসেছে।

শারাপোভার সফলকার মাপকাঠি:

পাঁচটি গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপা, ৩৬টি ক্যারিয়ার একক শিরোপা, বিশ্বের সাবেক এক নম্বর খেলোয়াড় এসব অবিশ্বাস্য সাফল্য কিছুতেই তার সমৃদ্ধ ব্যাংক হিসাবের সাফল্যের সঙ্গে পেরে উঠবে না!

নারী ও পুরুষ মিলিয়ে টেনিসের অন্যতম শীর্ষ ধনী অ্যাথলিট হিসেবে অবসর নিলেন শারাপোভা। টেনিসে মাত্র পাঁচজন পুরুষ খেলোয়াড় তার চেয়ে বেশি আয় করেছেন।

তারা হলেন—নোভাক জোকোভিচ, রজার ফেদেরার, রাফায়েল নাদাল, অ্যান্ডি মারে ও পিট সাম্প্রাস। তার চেয়ে বেশি আয়কারী একমাত্র নারী সেরেনা উইলিয়ামসই ছিল। তবে সেরেনার খেলোয়াড়ী জীবন আরো অনেক বড়।

ধারাবাহিক ইনজুরির কারণে কোর্টে ফ্লপ করায় আয়ও কমতে থাকে তার তবে শিরোপা কিংবা অর্থ উপার্জনে আগেই তিনি গ্রেটদের তালিকায় নিজের নাম যুক্ত করেছেন। টানা ১১টি বছর আমেরিকান বিজনেস সাময়িকী ফোর্বসের সমীক্ষায় শীর্ষ ধনী নারী অ্যাথলিটের সম্মান পেয়েছেন।

টেনিসে ধূমকেতুর মতো তার আবির্ভাব ঘটে ২০০৪ সালের উইম্বলডন ফাইনালে

গত চারটি বছর বিশাল অংকের আয় থেকে বঞ্চিত হন শারাপোভা। এর পরও ক্যারিয়ারে সব মিলিয়ে ৩২ কোটি ৫০ লাখ ডলার (প্রায় ২ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা) আয় করেছেন এ রুশ ললনা। প্রাইজমানি, এনডোর্সমেন্ট ও প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে এ আয় আসে তার।

কোর্ট থেকে আয় করেন ৩ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। নারী টেনিস তারকাদের মধ্যে আয়ে দুই নম্বরে থেকে অবসর নিলেন তিনি। ৩৫ কোটি ডলার আয় করে শীর্ষস্থানটি ধরে রেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেরেনা উইলিয়ামস।

২৩ বারের গ্র্যান্ড স্লাম চ্যাম্পিয়ন সেরেনা অবশ্য ৩৮ বছর বয়সে এখনো খেলে যাচ্ছেন। তাই আয়ে সহসাই তাকে কেউ সিংহাসনচ্যুত করা সহজ বলে মনে করছেন না ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা।

মারিয়া শাপোভার শৈশবের কথা:

রাশিয়া থেকে শৈশবে পিতা-মাতার সাথে আমেরিকায় পাড়ি জমানো শারাপোভার বসবাস ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে। রুশ পতাকায় টেনিস খেললেও থাকেন আটলান্টিকের ওপারেই। ২০০১ সালে পেশাদার টেনিসে যাত্রা শুরু করেন।

তবে টেনিসে ধূমকেতুর মতো তার আবির্ভাব ঘটে ২০০৪ সালের উইম্বলডন ফাইনালে। ওই ম্যাচে সেরেনা উইলিয়ামসকে হারিয়ে মাত্র ১৭ বছর বয়সে শিরোপা জয় শুরু হয় তার।

ওই জয়ের আগে তার স্পন্সর ছিল শুধুই নাইকি ও প্রিন্স তবে এরপর মোড় ঘুরে যায় ৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার লাবণ্যময়ী শারাপোভা। মাশা ছিলেন নামি-দামী ব্র্যান্ডগুলোর কাছে এক স্বপ্ন। শিগগিরই বাজারের কর্তৃত্ব নিতে থাকে তার এজেন্ট আইএমজি।

ট্যাগ হিউয়ার, ক্যানন, মটোরোলা, কোলগেট-পালমোলিভসহ অনেক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করতে থাকেন মাশা। তার নাইকি চুক্তির আর্থিক মূল্যও বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেল। এতে তার বার্ষিক আয় ৩০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে হয়ে গেল ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার! এতে অচিরেই তিনি হয়ে গেলেন এ ভুবনের শীর্ষ ধনী নারী খেড়োয়াড়।

কোর্টের পাশাপাশি বাণিজ্যের জগতে তার জয়যাত্রা তখন চলছেই। এরপর তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ল্যান্ড রোভার, পেপসিকো ও সনির মতো শীর্ষ ব্র্যান্ড। তার নামে টেনিসের নানা পণ্য বাজারে নিয়ে এল নাইকি। তার নামের ব্যালে ফ্লাট সু তো সর্বাধিক বিক্রির রেকর্ডই গড়ে বসে।

এভাবেই ট্যুর টেনিসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণে পরিণত হন শারাপোভা ও প্রদর্শনী ম্যাচের জন্য ৫ লাখ ডলার ফি নেয়া শুরু করেন। টেনিসের খ্যাতি কাজে লাগিয়ে ২০১২ সালে ‘সুগারপোভা’ নামে নিজের ক্যান্ডি লাইন ব্যবসা শুরু করেন তিনি ও এখন তা দারুণ প্রতিষ্ঠিত। পরে এর সঙ্গে কাপড় ও অ্যাকসেসরিজ যুক্ত করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিশাল অনুসারী গড়ে ওঠে শারাপোভার, যা তার আয়ের আরেকটি বড় উৎস। ২০১৬ সালে নিষিদ্ধ হওয়ার আগের বছর তিনি ফেসবুক থেকে আয় করেন ৩ কোটি ডলার।

নিষিদ্ধ হওয়ার পর তাকে ছেড়ে যায় ট্যাগ হিউয়ার, কোর্টের বাইরের আয়ও কমতে থাকে। যদিও নাইকি, এভিয়ান ও পোরশের মতো ব্র্যান্ড তাকে ছেড়ে যায়নি। ২০১৭ সালে খেলায় ফিরলেও কাঁধের ইনজুরি তাকে মারাত্মকভাবে ভোগাতে থাকে।

২০১৯ সালে মাত্র ১৫ ম্যাচ খেলেছেন, তখন তিনি র‍্যাংকিংয়ের ৩৭৩-এ নেমে যান। তার সর্বশেষ টুর্নামেন্ট ছিল গত মাসে অনুষ্ঠিত অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে, যেখানে তিনি প্রথম রাউন্ডেই হেরে যান। তখনই গুঞ্জন ওঠে, হয়তো আগামী বছর মেলবোর্ন পার্কে তাকে দেখা যাবে না। সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো।

৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার লাবণ্যময়ী শারাপোভা

পাঁচটি গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপা ও সব মিলিয়ে ৩৬টি একক শিরোপা সঙ্গী করে অবসরে গেলেন শারাপোভা। ইতিহাসে মাত্র ১০ নারী চার ধরনের গ্র্যান্ড স্লামই জিতেছেন, শারাপোভা তাদের অন্যতম। পাঁচটি ভিন্ন সময়ে র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষে ওঠার গৌরব দেখিয়েছেন।

শারপোভার ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার প্রাইজমানি নারী টেনিস তারকাদের মধ্যে তৃতীয় অবস্থান। তার চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন সেরেনা (৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার) ও তার বড় বোন ভেনাস উইলিয়ামস (৪ কোটি ১০ লাখ ডলার)।

বিদায়ের ঘোষণায় শারাপোভার মন ছুঁয়ে নেয়া কথা, ‘টেনিসই আমাকে বিশ্ব দেখিয়েছে এবং আজ আমি যা, তা টেনিসই করে দিয়েছে।’

কোর্টের প্রাইজমানি থেমে গেলেও আয় কমবে না শারাপোভার। সুগারপোভা দারুণ সফলতা পাচ্ছে। ২০১৯ সালে ২ কোটি ডলার রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে কোম্পানিটি। এবিসির ‘শার্ক ট্যাংক’ অনুষ্ঠানে নিজের ‘উদ্যোক্তা’ পরিচয় নিয়ে কথা বলেছেন টেনিসের এ সুপারস্টার। বিদায় ঘোষণার পর এটি তার প্রথম অনুষ্ঠানে যোগ দান।

অসংখ্য অনুরাগীর চোখে জল:

ভ্যানিটি ফেয়ার ম্যাগাজিনে একটি আবেগঘন লেখা শেয়ার করেছেন শারাপোভা। লিখেছেন, ‘‘ যে জীবনটাকেই শুধু জেনেছি তা পেছনে ফেলে দিই কী করে? ছোটবেলা থেকে যে কোর্টে খেলা শিখেছি তার থেকে দূরে যাই কী করে ‘’

‘‘ সেই খেলা যা একই সঙ্গে কান্না ও আনন্দ দিয়েছে। ২৮ বছরেরও বেশ সময় ধরে যে খেলা আমার  পরিবার ও অনুরাগীদের সঙ্গে নিয়ে চলেছে তবে আমি এতে নতুন। তাই আমাকে ক্ষমা কোরো, টেনিস। আমি বিদায় জানাচ্ছি তোমাকে!’

বিশ্বের ৩৭৩ তম খেলোয়াড় হয়ে বিদায় নিলেন শারাপোভা তবে তিনি থাকবেন টেনিসের ১ নাম্বার তারকা হয়েই। তার অসংখ্য ফ্যানের আজ মন খারাপ। আবেগঘন এই লেখা চোখে জল এনেছে তাঁর অসংখ্য অনুরাগীদের।

সুন্দর ও প্রতীভা একসাথে খুব কম মানুষের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। যা দেখা গেছে মারিয়া শারাপোভার বেলায়। আন্তর্জাতিক টেনিসে একটি বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।

কোটি সমর্থকের প্রিয় মুখ মারিয়া শারাপোভাকে কোর্টে র‍্যাকেট নিয়ে আর ছুটতে দেখা যাবে না এখন খুঁজতে হবে ফাইল ছবিতে!

ইনজুরির কাছে হার মেনে টেনিসকে বিদায় জানানো রুশ সুপারস্টার জীবনের এ অধ্যায়ে এসে কী করবেন তাই এখন দেখার বিষয়। জয়তু মারিয়া শারাপোভা।

তথ্যসূত্র:

বিবিসি স্পোর্টস, এনডিটিভি স্পোর্টস, আনন্দবাজার, ফোর্বস, আল জাজিরা, নিউ ইয়র্ক টাইমস, ডুব্লিউটিএ, সিএনএন, হাফিংটন পোস্ট, গাডির্য়ান, ওয়াশিংটন পোস্ট।

আরো দেখুন

Leave a Comment