কোন তারপিনের দাম কত?

কোন তারপিনের দাম কত?

নাম তারপিন হলেও তার ও পিনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। বৃক্ষ তোমার নাম কী ফলেই পরিচয়। এ প্রবাদের যেন বাস্তব চিত্র তুলে ধরে তারপিন।

মূলত তারপিনের কার্যকারিতাই এর পরিচয়। রং পাতলা, রঙের সঠিক পরিমাপ ও পরিষ্কারের কাজেও তারপিন ব্যবহার করা হয়। তা এক ধরনের রাসায়নিক উপাদান। এটি তেল জাতীয় দ্রাবক।

ইংরেজী শব্দ Turpentine Oil বা তারপেন্টাইল অয়েল থেকে তারপিন শব্দটি এসেছে। এর উৎপত্তি হয়েছে গ্রীক শব্দ টেরিবিনথে থেকে। যা একটি গাছের নাম। এটি এক ধরনের গাছ। এই গাছ প্রথম দিকে রজন উৎপাদনে ব্যাপক ব্যবহৃত হত।

তারপিন এর ব্যবহার:

  •  রং পাতলার করার কাজে
  •  বিভিন্ন প্রকার জৈব দ্রবণ ব্যবহার উপযোগী করতে
  •  রং এর সঠিক পরিমাপ নির্ধারণে
  •  ব্রাশ পরিষ্কার করা (পরের বার ব্যবহারের জন্য)
  •  কাজ শেষে হাত পরিষ্কার করার কাজে

দর-দাম:

তারপিন যেমন ব্র্যান্ডের কোম্পানির রয়েছে তেমনি রয়েছে নন ব্র্যান্ডের বা খোলা বাজারের। ব্র্যান্ডের মধ্যে ৪ লিটার বা এক গ্যালন তারপিন বিক্রি হয়।

আর নন ব্র্যান্ড বা খোলা এক লিটার তারপিন তেল বিক্রি হয় বিভিন্ন দামে বাজারে। তবে কোম্পানির সুনামের উপর দামের তারতম্য হয়ে থাকে।

নিচে কয়েকটি কোম্পানির তারপিনের নাম, দাম ও পরিমাণের বর্ণনা দেওয়া হলো-

 

 নাম———-দাম (প্রতি লিটার) 

বার্জার———১২০-১৫০ টাকা

রোমানা——- ১২০-১৫০ টাকা

ঝিলিক ——–১০০-১২০ টাকা

 যমুনা ———-১০০-১২০ টাকা

   

নাম——দাম (প্রতি ৫ লিটার)

বার্জার—৫০০-৫৫০ টাকা

রোমানা—৫০০-৫৫০ টাকা

ঝিলিক—৪৫০-৫০০ টাকা

 যমুনা—৪৫০-৫০০ টাকা

তারপিন এর উৎপাদন:

বিভিন্ন জাতের জীবন্ত পাইন গাছ থেকে খেজুরের রস সংগ্র করার মতো প্রথমে রজন সংগ্রহ করা হয়, পরে পাতন ও বাষ্প পাতন প্রক্রিয়ায় তারপিন তেল সংগ্রহ করা হয়। তারপিন তেল দেখতে তরল। রং হালকা হলদেটে। আঠালো জাতীয়।

তারপিনের উৎস:

শুরুর দিকে ভূমধ্য সাগরীয় অঞ্চলের পাইন গাছ থেকে তারপিন তেল সংগ্রহ করা হতো। তবে যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে বদল হয়েছে এ তেলের উৎসের। আজকাল চায়না, স্কেকিও এবং সাইপ্রিয়ান অঞ্চলের পাইন গাছ থেকে তারপিন তেল উৎপাদন করা হয়।

তারপিন তেল উৎপাদনে সবচেয়ে গুরুপূর্ণ হচ্ছে সামুদ্রিক পাইন, আলেপ্পো পাইন, মধ্যচীন ও দক্ষিণ চীনের পাইন, সুমাত্রান পাইন, লংলীফ পাইন যা আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের টেক্সাস, মেরিল্যান্ড মধ্য ও সেন্ট্রাল ফ্লোরিডায় পাওয়া যায়।

সামুদ্রিক অঞ্চলের পাইন গাছকে বলা হয় পাইনাস পাইনেস্টার, আলোপ্পো অঞ্চলের পাইনকে বলা হয় পাইনাস হ্যালিপেনসিস, দক্ষিণাঞ্চলীয় ও মধ্য চীনের পাইনকে পাইনাস ম্যাসোনিয়ানা নামে পরিচিত।

এছাড়া সুমাত্রার পাইন পাইনাস মারকুসি, আর লংলীফ অঞ্চলের পাইনকে পাইনাস প্যালোট্রিস নামে পরিচিত। এ পাইন গাছ পাইনাস টাডিয়া লবালি পাইন নামে সর্বাধিক পরিচিত। এগুলো সেন্ট্রাল টেক্সাস থেকে ফ্লোরিডা উত্তর দেলওয়ারা থেকে দক্ষিণ নিউ জার্সি পর্যন্ত বিস্তৃত।

বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন:

১৯১২ সালে প্রথম পাইন গাছের চাষ শুরু হলেও আমেরিকার ফ্লোরিডার উত্তরাঞ্চলীয় ১৯৩৬ সালে বাণিজ্যিকভাবে এ গাছের চাষ শুরু হয়। ১৯০৬ -২০ সাল পর্যন্ত সিরকা নামে জর্জিয়ার একটি কোম্পানি তারপিইনটাইন সাশ্রয়ী মূল্যে ক্রয় শুরু করে।

এছাড়া কানাডিয়ান বাসম কোম্পানি তারপিন তেলের জন্য বিখ্যাত। ওয়ের্স্টান লারিক্স নামে ইতালির ভেনিসের একটি কোম্পানি তারপিন কাঁচামাল সরবরাহ করে।

তারপিন সংগ্রহ পদ্ধতি:

বাস্পপাতন প্রক্রিয়ায় গাছ থেকে ক্রড তেল সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া পাইন কাঠ থেকে পাতন প্রক্রিয়ায় তারপিন তেল সংগ্রহ করা যায়।

এছাড়া গুড়ি, মূল ও কাঠ ন্যাপথা পদ্ধতিতে সংগ্রহ করা হয়। এ ক্ষেত্রে ৯০-১১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১৯৫ -২৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইড তাপমাত্রায় সিদ্ধ করার পর রজন থেকে পরে তেল সংগ্রহ করা হয়।

তারপিনের বহুবিধ ব্যবহার:

তারপিন তেল ঘরোয়া কাজে ও বাণিজ্যিক কাজেও ব্যবহৃত হয়। তারপিন প্রাথমিকভাবে দুইভাবে ব্যবহার করা হয়। প্রথমটি হচ্ছে দ্রাবক হিসেবে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে  সংশ্লেষণ হিসেবে। দ্রাবক হিসেবে তারপিন তেল জাতীয় পেইন্টে ব্যবহৃত হয়।

যেমন- ভার্নিশের কাজে। রাসায়নিক কোম্পানিতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় তারপিন। ক্রুড তেলের বদলে বাণিজ্যিকভাবে তারপিন তেল ব্যবহৃত হয়। যেমন- আগে কেরোসিন তেল ব্যবহৃত হতো এখন তার বদলে তারপিন ব্যবহৃত হয়।

তারপিন রাসায়নিক উপাদানের মিশ্রণের কাজে কাঁচামাল হিসেবে তারপিন ব্যবহৃত হয়। বেশি তাপমাত্রায় তারপিনকে রজন হিসেবে বিক্রি করা হয়ে থাকে।

প্রাচীন যুগে তারপিনটাইন ও পেট্রোলিয়াম মিশ্রণ করে কয়লার তেল ও কেরোসিন বানিয়ে ঘরোয়া চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করা হতো। ঘর্ষণজনিত আঘাতের ক্ষত রোধে পশুর চর্বির সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করা হতো।

একইভাবে গলা রোগ ও স্নায়ু রোগে ব্যবহৃত ওষুধের সাথে তারপিন মেশানো হতো। এছাড়া শ্বাস প্রশ্বাসের রোগীদের ইনহেলার যন্ত্রে তারপিন ব্যবহার করা হয়।

লেখক: মোহাম্মদ রবিউল্লাহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *