উদীয়মান ডিজিটাল বাংলাদেশ

উদীয়মান ডিজিটাল বাংলাদেশ

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দেশকে ভবিষ্যতের গন্তব্য হিসাবে গড়ে তুলতে বাংলাদেশ টেকসই অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। দেশজুড়ে ২৮ টি হাই-টেক পার্কে উন্নয়নমূলক কাজ চলছে যা বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পাশাপাশি স্থানীয় উদ্ভাবনকে সমর্থন করে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।

সংশ্লিষ্ট সকল অবকাঠামো সম্পন্ন করে ১০ লাখ স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাত থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এক দশক আগে আওয়ামী লীগ সরকার দেশে প্রথমবারের মতো প্রযুক্তি কেন্দ্রিক নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করে।

দূরদর্শী নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে জ্ঞান-ভিত্তিক অর্থনীতির দিকে নিয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হাই টেক পার্ক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল বাংলাদেশকে উদ্ভাবক ও নির্মাতাদের গন্তব্য করা।

ইতিমধ্যে দেশের তিনটি হাই টেক পার্ক কাজ শুরু করেছে। এছাড়াও এ হাই-টেক পার্কগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। বাংলাদেশী কোম্পানি ডাটাসফট হাই-টেক পার্ক প্রযুক্তি পণ্য চালান দিতে শুরু করেছে। গত বছর মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোতে আইওটি রফতানি করেছে ডাটা সফট।

ডাটা সফট বাংলাদেশের নিজস্ব তৈরি সম্পূর্ণ প্রযুক্তি ব্র্যান্ড বিদেশে রফতানি করেছে। এ সংস্থাটি বিভিন্ন ধরণের গ্যাজেট আইটেমগুলোকে একত্রিতকরণ শুরু করেছে। গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটিতে ইন্টারনেট অফ থিংস (আইওটি) ডিভাইস, স্মার্ট রিস্ট ব্যান্ড ও দুই ধরণের ল্যাপটপ একত্রিত করে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের নিজস্ব ব্র্যান্ডকে আরও সুসংহত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।

বিশ্বজুড়ে উদ্ভাবনী ও সাশ্রয়ী মূল্যের সফটওয়্যার সলিউশন কোম্পানি হিসেবে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছে ডাটাসফট। বিশ্বের ৫ শতাধিক সংস্থা এর গ্রাহক।

টেকনো মিডিয়া লিমিটেড বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ভাইব্র্যান্ট কর্পোরেশনের যৌথ উদ্যোগে গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটিতে একটি প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য জায়গা নিয়েছে। যেখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, এই প্লান্টটি প্রতিদিন প্রায় দুই শতাধিক মেশিন একত্রিত করবে এবং বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা বিদেশী বিশেষজ্ঞদের সাথে জ্ঞান ভাগাভাগির পাশাপাশি এই প্লান্ট স্থাপনে নেতৃত্ব দেবেন। গত বছরের নভেম্বরে চীনা বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ বিবেচনা করে বাংলাদেশের হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

দেশের প্রযুক্তি খাতে আরও বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য দেশের হাই-টেক পার্কগুলোতে পরিচালনা নির্দেশিকা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে হাই-টেক পার্কগুলোকে বৈধভাবে আরও বিদেশী সরাসরি বিনিয়োগের পথকে সুগম করেছে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। গাজীপুর ও যশোরে দুটি পার্ক যথাক্রমে চলছে এবং কর্তৃপক্ষ ১৩ টি অবকাঠামোকে হাই-টেক পার্ক হিসাবে ঘোষণা করেছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয় ।

বাংলাদেশী কোম্পানি ওয়ালটন গাজীপুরের হাই-টেক পার্কে মোবাইল, ল্যাপটপ এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস একত্রিত করে অর্থনীতির বিকাশের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বহু স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক কোম্পানি যৌথ উদ্যোগে প্রযুক্তি পণ্য উত্পাদন করছে। একই সাথে বৈশ্বিক জ্ঞানকে ভাগাভাগি করে স্থানীয় মানব সম্পদকে উৎপাদনে ব্যবহার করছে কোম্পানিটি।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, মানবসম্পদ ও কানেকটিভিটিসহ একাধিক বিষয় বিবেটনায় এনে দেশের ডিজিটাল সকল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশকে ডিজিটাল বিশ্বের প্রবেশদ্বার হিসাবে স্থাপন করা লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এছাড়াও দক্ষ, সজ্জিত ও ডিজিটাল প্রতিভা বিকাশের জন্য একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

আগামী সাত বছরের মধ্যে দেশজুড়ে উচ্চ গতির সংযোগ প্রসারিত করতে সরকার পঞ্চম প্রজন্মের (ফাইভ জি) মোবাইল নেটওয়ার্কের একটি রোডম্যাপ তৈরি করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী দুই বছরের মধ্যে ঢাকা কানেকটিভিটির সাথে পরিচিত হবে। ২০২৩ সালের মধ্যে জেলা সদর ও ২০২৬ সালের মধ্যে ইউনিয়ন গুলোতে সম্প্রসারণ করা হবে।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে চতুর্থ প্রজন্মের মোবাইল ইন্টারনেট যুগের সূচনা হয়। এটি এমন একটি পদক্ষেপ যা ডিজিটাল কানেকটিভিটির নতুন অধ্যায় যা সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশনকে বাস্তবের কিছুটা কাছে নিয়ে যায়। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চারটি অপারেটরের সাথে ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত রয়েছেন প্রায় ৯২.৩ মিলিয়ন ব্যবহারকারী।

প্রযুক্তি খাতে আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন হওয়ার জন্য সরকার প্রযুক্তি পেশায় ৬৫ হাজার লোককে প্রশিক্ষিত করেছে। প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করে প্রযুক্তি পেশাদারদেরকে দক্ষ করার লক্ষ্যে কাজ করছে। অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউট অনুসারে, বিশ্বের অনলাইন কর্মীদের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। দক্ষতা আরও বাড়ানোর জন্য দেশের ১৩০ টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে।

আইওটি, ব্লকচেইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডাটা ও অ্যানালিটিক্স – উদীয়মান এ প্রযুক্তি সম্পর্কে পেশাদারদের প্রশিক্ষণের উপর সরকারের জোর দৃষ্টি রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন হাই-টেক পার্কগুলো শিল্পের বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কেন্দ্র হবে। হাই-টেক পার্ক নির্মাণ করে রফতানি আয় বাড়ানোর সাফল্যের গল্প হিসাবে তারা দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, জাপান, ভারত এবং ভিয়েতনামের উদাহরণ তুলে ধরেন।

হাই-টেক পার্ক তৈরি, পরিচালনা ও উন্নয়নের মাধ্যমে আইসিটি শিল্পের বিকাশের জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসাবে ২০১০ সালে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ) প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটি (বিএইচটিসি) পাঁচটি ব্লকে বিভক্ত। ৩৫০ একর জমির উপর দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল।

ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে এটি অবস্থিত। এ অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, রেল ও সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করে সরকার ‘বন্ডেড ওয়্যারহাউস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিশেষ প্রণোদনাও রয়েছে বিনিয়োগকারীদের জন্য। সামিট টেকনোপলিস ২০৭ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে বিএইচটিসির দ্বিতীয় এবং পঞ্চম ব্লক তৈরি করছে।

পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ টেকনোসিটি লিমিটেড (বিটিএল) বিএইচটিপি এর কালিয়াকৈরে ব্লক ৩ তে ডিজাইন, নির্মাণ, ফিনান্স, অপারেট এবং ট্রান্সফার এর কাজ করবে। বিটিএল প্রযুক্তি-ভিত্তিক সংস্থাগুলোর জন্য বিশ্বমানের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল সুবিধা বিকাশ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এছাড়া জাতীয় ও বহু-জাতীয় কর্পোরেশন উভয়ের জন্য আকর্ষণীয় বিনিয়োগের গন্তব্য হিসাবে বাংলাদেশ ও বিএইচটিসিকে প্রচার করতে বাধ্য থাকবে।

সরকার এই আইটিতে পার্ক ছাড়াও আরো ১২ আইটি পার্ক স্থাপনেরও পরিকল্পনা করেছে। যা “ডিজিটাল বাংলাদেশ” গঠনে সহায়ক। জামালপুর, নাটোর, ঠাকুরগাঁও, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, কেরানিগঞ্জ (ঢাকা), বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা এবং চট্টোগ্রামে পৃথক ১২ টি জেলায় মোট ১২ টি পার্ক স্থাপন করা হবে।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ জনতা টাওয়ার সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, যশোর শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কটি সফলভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। সারাদেশে আরও বেশ কয়েকটি হাই টেক পার্ক নির্মাধীন রয়েছে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী সিলেট হাই-টেক পার্ক ( সিলেট ইলেক্ট্রনিক্স সিটি ) উন্নয়নের কাজ করছে। যা ১৩৪৪.০২ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হবে। রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিকটবর্তী ৩১ একর জমির উপর নির্মাণ করা হচ্ছে বরেন্দ্র সিলিকন সিটি। এর নির্মাণ কাজ শেষ হলে ১৪,০০০ সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি করবে।

দেশে আরও বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। প্রাইসওয়াটার হাউস কুপার্স (পিডব্লিউসসির) এর তথ্যানুসারে, বিএইচটিসিতে দুই শিফটের ভিত্তিতে প্রতি শিফটে ৭৫ হাজার লোক কাজ করতে পারবে আর তিন শিফটে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার লোক কাজ করার সুযোগ পাবে। যদি প্রায় একই আকারের মোট পাঁচটি হাই-টেক পার্ক নির্মাণ করা যায় দশ লাখ কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করা সম্ভব।

পাঁচটি হাই-টেক পার্ক চালানোয় বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এটির জন্য প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। দক্ষ কর্মী বাহিনীর বিকাশের জন্য অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। এটি ১৫ বছরে অর্জন করা যাবে।

অন্যান্য নতুন হাই-টেক পার্কগুলো সফল হওয়ার জন্য এটি নিশ্চিত করা দরকার যে বাংলাদেশের প্রথম হাই-টেক পার্ক বিএইচটিসি সফল হয়েছে। বিএইচটিসি সফল হলে, পরবর্তী ১০ বছরে ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এর পরের পাঁচ বছরে অন্যান্য চারটি হাই-টেক পার্কের আরও ৮ লাখ কর্মসংস্থানে পৌঁছানো যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *