অনলাইনে ট্রল ও সাংবাদিকতা

ট্রল

প্রযুক্তির ‍উপর ভর করে এগিয়ে চলছে বিশ্ব। পৃথিবীর উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত সব স্থানের মানুষ প্রযুক্তির সুবাধে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছেন। কেউ অনলাইনে আবার কেউ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বুদ হয়ে থাকছেন। এখানে বয়সের কোনো বালাই নেই।

এক দশক আগেও অনলাইন সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের অবস্থান এমন আড়াআড়ি ছিল না। ট্রল শব্দটি সাংবাদিক ও অসাংবাদিকদের কাছে এতোটা পরিচিত ছিল না। অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। গত কয়েক বছরে ট্রল শব্দটি একটি জনপ্রিয় শব্দে পরিণত হয়েছে। অনলাইন ও সামাজিক মাধ্যমে শব্দটি জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

এই জাতীয় ট্রলগুলো নৈতিকতা গঠনে কতটা সহায়ক হতে পারে। প্রথমে বুঝতে হবে কেন ট্রলিংয়ের মতো জিনিসগুলো প্রথম দিকেই এতো জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

মানুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মিডিয়া ও প্রকাশনা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে তৈরি করা খবরের দিকে আগ্রহ নিয়ে হয়ে থাকে। মিডিয়া ও জনগণের মধ্যে সম্পর্কটি মূলত সরল যোগাযোগের। মিডিয়া বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করে আর জনগণ তা জানতে পারে।

একজন সাধারণ মানুষ মিডিয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভাল যেটা করতে পারে তা হল সম্পাদকীয় বিভাগে একটি চিঠি লেখা বা সেই সংবাদপত্র বা সাময়িকী কেনা বন্ধ করা, বা সেই চ্যানেলটি দেখা থেকে বিরত থাকা।

অনলাইন মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়া সেটি বদলে দিয়েছে। এ দুই মাধ্যম জনগণকে তাদের মতামত সম্পর্কে সোচ্চার হওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। পাঠক যে কোনো ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া অনলাইন নিউজ ওয়েবসাইটগুলোর মন্তব্য বিভাগে প্রকাশ করতে পারেন।

সোশ্যাল মিডিয়ায়, একজন ব্যক্তি যে কোনও সমস্যা সম্পর্কে বিশ্লেষণ লিখতে পারেন। একই সাথে যে কেউ দেখার জন্য এটি পোস্টও করতে পারেন।

এই নতুন মত প্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই অপব্যবহারের জন্য দায়ী। ইন্টারনেট ট্রলিং ও সাইবার বুলিংকে মত প্রকাশের স্বাধীনতার অপব্যবহারের অংশ হিসাবে অভিহিত করা যেতে পারে। সমস্যা হল, এই জাতীয় ট্রলগুলো তাদের চিন্তাভাবনা প্রক্রিয়ার কিছু অন্ধকার অংশ প্রকাশে আরও সাহসী করে তোলে।

ট্রলগুলোর সহায়তায় মানুষজন ভার্চুয়াল বিশ্বে প্রবেশ করছে ও তাতে জনজীবন আরো বিভাজিত হয়ে যাচ্ছে। প্রায়শই সাংবাদিক ও লেখকরা শেষের দিকে এই ধরণের ট্রলিংয়ের দিকে ঝোঁকেন। সাংবাদিক হিসেবে ট্রলগুলোতে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে সাংবাদিকদের ভূমিকা বোঝা দরকার। একটি মিডিয়া আউটলেট কেবল একটি সংস্থাই নয়। একজন সাংবাদিক কেবল অফিসিয়াল পরিচয়পত্রের পেশাদার নন। তার অনেক দায়িত্ব থাকে।

একজন সাংবাদিকের আইডি কার্ডে সাধারণত “প্রেস” শব্দটি লেখা থাকে এবং এই শব্দটি সাংবাদিক বা এমনকি কোনও নির্দিষ্ট মিডিয়া হাউসের চেয়ে অনেক বড়। এটি এমন একটি সংস্থার প্রতিনিধিত্ব করে যার সার্বজনীন সমস্যা ও ঘটনাগুলোর তদারকি ও জনসাধারণের বিষয়ে তার দায় রয়েছে।

সাংবাদিকদের দেওয়া ঘটনা প্রবাহের উপর একটি নির্দিষ্ট জনগণের আস্থা রয়েছে। একটি সংবাদ সবার পছন্দ নাও হতে পারে। অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়ার আড়াআড়ি সম্পর্ক, সেই অপছন্দ ট্রলিং আকারে আসতে পারে তবে এর অর্থ এই নয় যে সাংবাদিকরা এর প্রতিক্রিয়া জানাবে।

তবে সাংবাদিকরা ট্রলের প্রতিক্রিয়া কীভাবে জানায় তা সাম্প্রতিক সময়ে মারাত্মক হয়ে উঠেছে। প্রথমদিকে, নিউজরুমে স্বাভাবিক নিয়ম ছিল ট্রলগুলোকে সংবাদে ব্যবহার না করা তবে, বিপুল সংখ্যক মিডিয়া আউটলেট সেই অবস্থান থেকে সরে গেছে, গল্পের আগ্রহ তৈরিতে ট্রলগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখে বলে তারা আবিস্কার করে।

এখানে বুঝতে হবে যে ট্রলগুলো শূণ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠে না বরং এটি জটিল আর্থ-সামাজিক অনলাইন ও মিডিয়া হাউসগুলোর আর্থিকভাবে বেঁচে থাকার মাধ্যম হিসাবে অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়। তবে বিশ্ব নাগরিক হিসেবে যুক্ত থাকতে কথোপকথন চালিয়ে যাওয়া ও চালিয়ে যেতে সহায়তা করতে পারাসহ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

ট্রল উদ্দেশ্য ও আচরণে বিভিন্ন আকার ও আকৃতির হওয়ায় বাঁধাধরা নিয়ম ভুলে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে। ট্রলিং এমনভাবে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে তাকে নিরুৎসাহিত করা যাবে না তবে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

সাংবাদিক হিসেবে ট্রলিংয়ের বিষয়ে নিজস্ব অবস্থান থাকাটা স্বাভাবিক বিষয়। ব্যবসায়িক পরিচালক ও বিপণন প্রধান অবশ্যই মিডিয়া হাউসের ব্যবসায়ের দিকটি তদারক করার সাথে সাথে ট্রলে লিপ্ত হতে পারেন তবে নিউজরুমের অনুশীলনকারীদের এই অনুশীলনে লিপ্ত হওয়া উচিত নয়।

প্রতিযোগিতার এই বিশ্বে সময়ের সাথে সাথে নিজেকে বদলাতে হবে। নয় তো টিকে থাকা মুশকিল। তাই অনলাইনে ট্রলকে উপেক্ষা করা যাবে না। আবার গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে পুরোপুরি জেঁকে বসা যাবে না সামাজিক মাধ্যমের উপর। সচেতন হতে হবে। কোনটি সত্য বা কোনেটি মিথ্যা তা যাচাই করে নিয়ে তার পর সিদ্ধান্তে আসলে উত্তম হবে।

লেখক: ফয়সাল মাহমুদ, সূত্র: দ্য ইন্ডিপেডেন্ট বিডি

আরো দেখুন

Leave a Comment